দিলীপ রায়

রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিতর্ক মামলায় রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের ঐতিহাসিক এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই। অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

অন্যদিকে, মসজিদ নির্মাণের জন্য অযোধ্যার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মুসলিমদের পাঁচ একর জমি দেওয়ার জন্য কেন্দ্র ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সেই সঙ্গে আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে আলোকপাত করেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

এদিন অযোধ্যা রায় দানে আদালত বলেছে, বাবরি মসজিদের ক্ষতি আইনের লঙ্ঘন ছিল। শীর্ষ আদালতের এই মন্তব্যে ফের প্রশ্ন উঠছে, কেন তবে এলকে আদবানি, মুরলি মনোহর যোশী, উমা ভারতীদের শাস্তি হবে না?

আরও পড়ুনঃ অয্যোধ্যা রায়ে অসন্তুষ্ট ওয়েইসি, ক্ষোভ উগড়ে দিলেন কংগ্রেসের ওপর

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদে হামলায় যুক্ত ছিলেন বিজেপির এই নেতারা। এই হামলা পরবর্তীতে অশান্তি, জীবনহানির ঘটনার তদন্তে গঠিত লিবেরহান কমিশন ও মুম্বাই দাঙ্গার তদন্তে গঠিত শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া কেন হল না, সে নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহল।

প্রসঙ্গত, এনিয়ে ক’দিন আগে বেশ কিছু সঙ্গত প্রশ্ন তোলেন জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ)-এর প্রাক্তন ছাত্র উমর খলিদ। একই সঙ্গে বাবরি থেকে দাদরি রক্তাক্ত পথ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশও করেন।

সংবাদ সংস্থার দেখা জানা গেছে, জেএনইউ-র এই প্রাক্তনী লেখেন, তাঁর স্মরণে আছে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ের সেই দগদগে দিনগুলোর কথা। বাবরি মসজিদে হামলা দেশের প্রজাতন্ত্রকে অসংখ্য আঘাত করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও লেখেন, সেই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দাঙ্গা, হিংসা, কারফিউর খবর আসে। গুজব এবং প্রকৃত ঘটনা প্রায় এক হয়ে যায়।সবথেকে বেশি গোলমালের খবর আসে মুম্বাই থেকে। এরপর ২৭ বছর পার হয়ে গিয়েছে।

এলকে আদবানির সেই বিখ্যাত রথযাত্রার পর যে  হিংসা ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে, তাতে গুটিকয়েকের শাস্তি হয়। কিন্তু এসবের মূল নায়কদের এখনও শাস্তি হয়নি।

আদবানির রথযাত্রা এবং দেশের নানা প্রান্তে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রামশিলা পুজোর পর করসেবকদের নিয়ে বাবরি মসজিদে হামলার পরবর্তীতে দেশ জুড়ে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে।

বাবরি মসজিদে হামলার ১০দিন পর এর তদন্তে গঠিত হয় লিবেরহান কমিশন। ১৭ বছর পর কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্য আসে।হিংসা, বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে শীর্ষ বিজেপি নেতা এলকে আদবানি, মুরলি মনোহর যোশি, উমা ভারতী, কল্যাণ সিংকে অভিযুক্ত করে এই কমিশন। পাশাপাশি অভিযুক্ত করে আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরঙ্গ দলকেও।

আরও পড়ুনঃঅয্যোধ্যা মামলা নিয়ে সুপ্রিম রায়কে স্বাগত রাজনৈতিক নেতাদের

কিন্তু এদের  কারও শাস্তি হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি দায়বদ্ধ থাকলেও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারও এক্ষেত্রে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। ফলে কোটি টাকা খরচ করে কমিশন হয়েছে, কমিশন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও বিচার অধরাই থেকে গিয়েছে।

অন্যদিকে, বাবরি ধ্বংসের পর সংগঠিত মুম্বাই দাঙ্গার তদন্তে গঠিত শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের অবস্থাও একই রকম হয়েছে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর এবং ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে দু’দফায় মুম্বাইয়ে দাঙ্গায় প্রায় ৯০০ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে হিন্দু ২৭৫ এবং মুসলিম ৫৭৫ জন।

আহত হয় দু’হাজারেরও বেশি মানুষ।শ্রীকৃষ্ণ কমিশন ২৫ হাজার পাতার রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টে প্রমাণ সহ কমিশন দেখায়, মুসলিমদের টার্গেট করে কিভাবে দাঙ্গা ছড়িয়েছে শিবসেনা। শিবসেনা নেতা বাল ঠাকরে, গজানন কীর্তিকর, মিলিন্দ বৈদ্য এবং বিজেপি নেতা মধুকর সরপোতদার ও গোপীনাথ মুন্ডের মতো নেতাদের অভিযুক্ত করে কমিশন।

এছাড়াও কমিশন তাঁর রিপোর্টে পুলিশের একপেশে ভূমিকাকেও তুলে ধরে। ১১টি ঘটনায় ৩১ পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে খুন ও লুটপাটের অভিযোগ আনে কমিশন। এমনকি যুগ্ম পুলিশ কমিশনার আরডি ত্যাগীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনে কমিশন।

কমিশনের অভিযোগ, সুলেমান বেকারি অভিযানে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ঠাণ্ডা মাথায় ন’জন মুসলিম যুবককে খুন করেন ত্যাগী। কিন্তু মুম্বাই দাঙ্গার এই অভিযুক্তদের শাস্তি হয়নি এখনও। মহারাষ্ট্রে একসময় ধর্মনিরপেক্ষ কংগ্রেস-এনসিপি সরকার ছিল।

কিন্তু এনিয়ে সেই সরকারও কোনও উদ্যোগ নেয়নি। এখানেই তুলনা টেনেছেন উমর। মুম্বাই ব্লাস্টের  ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। বিচার ব্যবস্থাকেও সাম্প্রদায়িক দিক থেকে একপেশে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, এই বিস্ফোরণের মামলা ওঠে টাডা কোর্টে। ১০০ অভিযুক্তের সাজা হয়। তাদের মধ্যে একজনের প্রাণদণ্ডও হয়। অন্যদিকে, মুম্বাই দাঙ্গা নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের রিপোর্ট কখনও কার্যকর হয় না। অপরাধী পুলিশ অফিসারদের শাস্তি হয় না।

এদের কারও কারও প্রমোশন হয়। আদবানির রথযাত্রা রক্তাক্ত করে মানুষের জীবন, প্রাণহানি ঘটায়। তবু তাঁর শাস্তি হয় না কেন?

আরও পড়ুনঃ#AYODHYAVERDICT: অযোধ্যার জমি রামলালার, অন্যত্র জমি সুন্নি ওয়াকফকে

এ প্রশ্ন তুলে উমর আরও লিখেছেন, বাবরি থেকে দাদরি, ২৭ বছর পর ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনির আসামীর গলায় প্রকাশ্যে মালা পরাচ্ছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। সেই ধারা এখনও চলছে। এদেশে দীর্ঘদিন ধরে সংখালঘু মানুষের প্রতি অবিচার চলে আসছে।

উমরের এই বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেছে এদিনও বলে মনে করছে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন।

অযোধ্যা রায়কে সম্মান জানিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানি, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের কামাল ফারুকি এবং এআইএমআইএম নেতা, সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here