‘দাদা’ এমন শব্দ। বাড়ির বড় বা বয়জ্যেষ্ঠ ভাইকে বলে থাকি । যাকে দেখেই বড় হয় ছোটরা। কোনও বিপদে পড়লে তাঁর কাছে পরামর্শ চায়। ভুল করলে শাসন করে । আবার ভালো সময়ে কাছের বন্ধুও হয়। কঠিন সময় কিভাবে লড়াই করবে সবকিছুই শিখি তাঁর কাছ থেকে। তাই এখনও সতীর্থদের কাছে ‘দাদা’ সৌরভ গাঙ্গুলি ।

 দল থেকে বাদ পড়েও দুরন্ত কামব্যাকে জায়গা ছিনিয়ে নেওয়া । ‘বিদেশের মাটিতেও জিততে পারি’ এই বিশ্বাস ফেরানো । মিথ্যে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। সব কিছুই শেখা এই বঙ্গতনয়ের কাছ থেকে।

  রঞ্জি ট্রফিতে নজরকাড়া পারফরমেন্সের পরই ১৯৯২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজে ভারতীয় জার্সিতে খেলার জন্য ডাক পড়ে সৌরভের। অভিষেক ম্যাচ সুখকর ছিল না প্রিন্স অফ ক্যালকাটার। মাত্র ৩ রান করেছিলেন তিনি। পরের ম্যাচগুলিতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যে, তিনি দাম্ভিক ও অহঙ্কারী। সহ-খেলোয়াড়দের ড্রিঙ্কস নিয়ে যেতে বললে বারণ করেন এই বেহালার ছেলে।

বসিয়ে দেওয়ার পর দলে ফেরার ইচ্ছাকে মাথায় নিয়ে অদম্য লড়াই শুরু করেন গডস অফ অফসাইড। ১৯৯৩-৯৪ ও ১৯৯৪-৯৫ মরশুমে রঞ্জি ট্রফিতে রানের ফুলঝুড়ি ঝরান তিনি। এছাড়া দলিপ ট্রফিতেও ১৭৭ রানের ঝাঁ চকচকে ইনিংসের পরই ফের ইংল্যান্ড ট্যুরে ভারতের হয়ে ডাক পান সৌরভ। সেই সিরিজেও প্রথম ম্যাচে রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয় তাঁকে। দ্বিতীয় ম্যাচে নভজ্যোত সিং সিধু চোটের কারণে ছিটকে যান । তাঁর বিকল্প হিসাবে খেলানো হয় সৌরভকে। সেই ম্যাচেই টেস্ট অভিষেক হয় তাঁর। ১৩৩ রান করে অভিষেক ম্যাচে লর্ডসের মাটিতে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও গড়েছিলেন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি গাঙ্গুলিকে।

২০০০ সাল। ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের একটি কলঙ্কময় সময়। ম্যাচ ফিক্সিং কাণ্ডে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের নাম জড়ায়। আজহারউদ্দিন সহ বাদও যায় বেশ কয়েকজন। সেই সময় চিন্তিত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। এই দুঃসময় দলের ব্যাটন কে সামলাবে ? আচমকাই বিসিসিআই ভারতীয় দলের দায়িত্ব তুলে দেয় বেহালার সেই ছেলের কাঁধে ।

   শুরু হয় ভারতীয় ক্রিকেটের ‘রেভলিউশন’। অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পরই সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৫-০ জয়। স্টিভ ওয়ের নেতৃত্বে তখন সেরা ও অপ্রতিরোধ্য দল অস্ট্রেলিয়া। ২০০১ সালে গাঙ্গুলির নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি জয় মেন ইন ব্লুর। ভারতীয় দলকে এক নতুন দিশা দেখালেন সৌরভ। এরপর ২০০২ সালের ত্রিদেশীয় নেটওয়েস্ট সিরিজ জয়। লর্ডসের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সিরিজ জিতে ছিল ভারত। তারপর ! লর্ডসের ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামের ব্যালকনি থেকে বঙ্গতনয়ের দাদাগিরি দেখেছিল গোটা বিশ্ব। পাকিস্তানের মাটিতে ওয়ান ডে এবং টেস্ট জেতা একমাত্র অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। ২০০৩ বিশ্বকাপে রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে সর্বোচ্চ রানের পার্টনারশিপও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।

নিজের স্থান ছেড়ে নতুনদের জায়গা করে দেওয়া, জুনিয়র খেলোয়াড়দের মোটিভেট করা। তাঁর অন্যতম গুন। সেই দিন যদি নিজের জায়গা তিনি না ছাড়তেন তাহলে হয়তো দিল্লির বীরেন্দ্রের বীরু হয়ে ওঠা হত না। জাহির, যুবরাজ, হরভজন ভারতীয় দলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে না। ফ্লপ হওয়ার পর যদি ধোনিকে নিজের তিন নম্বর স্থান না ছাড়তেন তাহলে হয়তো আজকের স্টার মাহিকে পেত না । তবে যাই হোক তিনি দেশকে বিশ্বকাপ না দিতে পারলেও জেতার এক নতুন সূত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন ।

ভারতীয় ক্রিকেটকে তিনি যা দিয়েছেন তার জন্য অবশ্যই একটা কথা প্রযোজ্য- ‘মহারাজা তোমায় সেলাম’ ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here