লোকে বলে, তিনি ভেঙেছেন সুখের ঘর। আমরা বলি, তিনি রচনা করেছেন বন্ধুত্বের নয়া সংজ্ঞা। লোকে বলে, তিনি কালবৈশাখী। আমরা বলি, কাঠফাটা রোদ্দুরে তিনি স্বস্তির বৈশাখী হাওয়া। লোকে বলে, রাজনীতির আঙিনায় তিনি নতুন। আমরা বলি, তাঁর নয়া পদচারণা রচনা করবে রাজনীতির নতুন অধ্যায়। তিনি বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাত্রছাত্রীদের কাছে যিনি আদরের বৈশাখীদি, তিনিই কলকাতার প্রাক্তন মেয়রের বন্ধুনী। নিন্দুকের মুখে ছাই দিতে এবার কলম ধরলেন হেভিওয়েট রাজনীতিবিদ বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। উগরে দিলেন আগুন। কেবলমাত্র পিপল টিভির হোম পেজে।শুরু হল নয়া ধারাবাহিক (কাল)বৈশাখী হাওয়া।

আজ চতুর্থ পর্ব।

||বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়||

লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে আমার যে ‘বাকযুদ্ধ’ এবং তার পরের ঘটনা পুরোটাই বাড়ি ফিরে বাবা শুনিয়েছিলেন মাকে। তখন আমার মা হাসতে হাসতে বাবাকে বলেছিলেন, এভাবে মেয়েকে বড় করলে ও আর কোনও ছেলের সঙ্গে ঘর করতে পারবে না। মেয়েকে বাড়িতে দিয়ে চলে যাবে।

ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি ঝুলিয়ে বাবা বলেছিলেন, যেভাবে মেয়েদের বড় করছি, দেখবে যে ঘরে যাবে, সেই ঘর আলো করবে। মেয়ের কদর না বুঝে তারা যদি মেয়ে ফেরত দিয়ে যায়, তাহলেও অসুবিধা নেই। ওদের সারাজীবন খাওয়ানোর ক্ষমতা আমি রাখি।

সেই কিশোরীবেলায় বাবার এই প্রশ্রয়টা পেয়েছিলাম বলেই আজও আমি স্বাধীনচেতা। এই যে লোকে আমাকে কটু কথা বলছে, না জেনে, না শুনে, না বুঝে এত রূঢ় কথা আমাকে বলছে, সেসব আমি ফুতকারে উড়িয়ে দিতে পেরেছি বাবা-মায়ের কাছে পাওয়া শিক্ষার শক্তি থেকেই। 

প্রথম পর্বঃ একাকিত্ব গ্রাস করেছিল এই বৈশাখীকেই

আগেই বলেছি মা আমার দশভুজা। তাঁর হাতের সূচিশিল্প খুব সুন্দর। আমরা সবাই তাঁর কাছ থেকে কম বেশি শিখেছি। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। স্কুল থেকে কাপড়ের ওপর ছবি আঁকতে বলেছিলেন আর্ট-টিচার। মা তখন খুব অসুস্থ। কে করে দেবে? তাই বাইরে থেকে করিয়ে নিয়ে স্কুলে জমা দিয়ে দিয়েছিলাম।

আর্ট-টিচার বলেছিলেন, এটা কি শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যকে দিয়ে আঁকিয়েছ? তুমি তো খুব বড়লোক! তাই ওঁকে দিয়ে করাতেও পার।বদরাগি আর্ট-টিচারকে সেদিনও উত্তর দিয়েছিলাম মুখের মতো। বলেছিলাম, সত্যি কথা বলতে কি ম্যাম, বাবা চাইলে ওঁকে দিয়ে আঁকাতেই পারতেন। তবে এটুকু কাজ করার মতো প্রতিভা আমাদের পাড়ায় রয়েছে প্রচুর। পাড়ারই একটি টেলারিং দোকানে করিয়ে নিয়েছি এটা।

কিশোরী কন্যের মুখে এহেন কথা শুনে শিক্ষিকা তো থ। স্কুলে আমার রেপুটেশন খুব ভালো ছিল। তাই এনিয়ে আর হইচই হয়নি। আর্ট-টিচার গল্পটি করেছিলেন ক্লাস টিচারের কাছে। ক্লাসটিচার ওঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ওকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বললে ও সব কাজই ঠিক ঠিক করে দেবে। ওর সঙ্গে উদ্ধত আচরণ করলে ও মেনে নেয় না। আমার বন্ধুরা এটা জানত।আমার কর্মজীবনে যাঁরা আমার বন্ধু হয়ে উঠেছেন, তাঁদের কাছেও এটা স্পষ্ট। 

দ্বিতীয় পর্বঃ এই বৈশাখীই কান্না লুকিয়ে রাখে হাসি চাপা দিয়ে

ছোট থেকে কোনওদিনই অন্যায় আমি করিনি। আপোসও করিনি অন্যায়ের সঙ্গে।তা সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোন না কেন! স্কুলে পড়াকালীন কৌশলে শিক্ষিকাদের বিষয়টি বুঝিয়েও দিয়েছিলাম।তার ফলও পেয়েছিলাম।

মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার সময় আর্ট-টিচারের রোষের শিকার হয়েছিলাম। মাধ্যমিকে সব বিষয়ে ভাল নম্বর পেলেও ওয়ার্ক এডুকেশনে অনেকটাই কম পেয়েছিলাম। খুব ভেঙে পড়েছিলাম। মার্কশিট দেখে মা বলেছিলেন, মার্কসটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মার্কস দিয়ে গুণের বিচার হয় না। তুমি কেমন পারফর্ম করলে, সেটাই বড় কথা। আমার সোনা মায়ের এই ‘মন্ত্রদীক্ষা’ যে আমার কাছে কত বড় পাওনা! 

তৃতীয় পর্বঃ চোখে চোখ রেখে কথা বলেছি মুখ্যমন্ত্রীরও

কিশোরীবেলায় শোনা মায়ের এই কথাটা আমি নিজেও বিশ্বাস করি। তাঁর সেদিনের এই কথাটা আমার মন-জমিনে প্রোথিত করেছিল আত্মবিশ্বাসের বীজ। আমার বাবা-মা সেই স্পেশটা দিয়েছিলেন বলেই আজ আমরা তিন বোনই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। ক্লাস টুয়েলভ অবধি গোখেলেই পড়াশোনা করেছি। পরে পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হই প্রেসিডেন্সিতে। শুরু হয় আমার জীবনের নতুন অধ্যায়।

(ক্রমশ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here