দিলীপ রায়

তেলেঙ্গানা গণধর্ষণ-খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের ‘এনকাউন্টার’-এ মেরে দেওয়া হয়েছে। ধর্ষকদের এই মৃত্যুতে তেলেঙ্গানা পুলিশকে শুভেচ্ছা-অভিনন্দন জানিয়েছেন সেলিব্রটি, রাজনীতিক সহ দেশের অগণিত মানুষ। আবার বিরুদ্ধ মতের প্রকাশও ঘটেছে।

একাধিক রাজনীতিক, নারী সংগঠনের প্রতিনিধি, মানবাধিকার কর্মী এর বিরোধিতা করেছেন। প্রাক্তন বিচারপতি এবং আইনজীবীদের একাংশ এভাবে বিচার হাতে তুলে নেওয়ার নিন্দা করেছেন।এই এনকাউন্টারের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও তুলেছেন কেউ কেউ।

এদেশে নারীরা একেবারেই নিরাপদ নয়। এটা নানান পরিসংখ্যানে স্পষ্ট। এখানে প্রতি ২০ মিনিটে একটি নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটে চলেছে।  ঘরে-বাইরে ধর্ষিতা হচ্ছে নারী। ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিনই। শিশু থেকে বৃদ্ধা ধর্ষিতা হচ্ছে সব বয়সের নারীই।

কিন্তু সরকারের তা নিয়ে হেলদোল খুব একটা দেখা যায় না।নারীদের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্যস্তরে পৃথক মন্ত্রক আছে। নারী সুরক্ষার স্বার্থে এখন বিভিন্ন রাজ্যে গঠিত হয়েছে ‘ওমেন সেল’, মহিলা থানা, রাজ্য মহিলা কমিশন। পাশাপাশি কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় মহিলা কমিশন।

বুক ফাটছে বাবা-মা’র…দায় কার?

কিন্তু ঠেকানো যাচ্ছে না ধর্ষণের ঘটনা।উল্টে বাড়ছে ধর্ষণ।তবে সব ধর্ষণের ঘটনা কিন্তু জাতীয় ক্ষেত্রে আলোড়ন ফেলে না। ফলে সেসব ঘটনা দ্রুত চাপা পড়ে যায়। স্থানীয় নেতা, পুলিশি মধ্যস্থতায় বহুক্ষেত্রে নিগৃহীতার পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্তের বোঝাপড়া হয়ে যায়।

সাধারণ গরীব পরিবারের মেয়ে নিগৃহীত হলে বিচার অধরাই থেকে যায়। সারা জীবন গ্লানি নিয়ে বাঁচতে হয় তাঁকে। আর ধর্ষিতা হতে থাকে ভারতীয় নারী।

কিন্তু কোনও কোনও ধর্ষণের ঘটনা জাতীয় ক্ষেত্রে  তীব্র আলোড়ন ফেলে দেয়। নারী নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসে। দেশ তোলপাড় হয়ে  ওঠে। প্রতিবাদী আন্দোলন, বিক্ষোভের চাপে নড়েচড়ে বসে রাজনীতিকরা। রাস্তার আন্দোলনের আঁচ গিয়ে লাগে সংসদে। শাসক বিরোধী জোর তরজা শুরু হয়ে যায়। দাবি ওঠে কড়া শাস্তির, নারী নিরাপত্তায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের।

২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বরে নির্ভয়া ধর্ষণ কান্ডে তেমনই তোলপাড় হয়েছিল দেশ। এর উত্তাপ পৌঁছেছিল সংসদেও। চাপে পড়ে তখন শাস্তি আরও কঠোর করে সরকার। নারী সুরক্ষায় গঠন করা হয় ‘নির্ভয়া ফান্ড’।

দেশব্যাপী চালু করা হয় হেল্প লাইন। কিন্তু তা প্রায় সময়ই বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় সময়েই অচল থাকতে দেখা যায়। পাশাপাশি, ধর্ষণের ঘটনার বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়ার জন্যও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার পায় না নিগৃহীতারা। ধীরে ধীরে এই অপরাধের ঘটনা চাপা পড়ে যায়।

ফের যখন কোনও মেট্রো শহরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তখন আবার রাজনীতিকরা এনিয়ে সোচ্চার হন। রাজপথ থেকে সংসদ গলা ফাটান তাঁরা। যেমন, হায়দ্রাবাদের তরুণী পশু-চিকিৎসককে গণধর্ষণ-খুনের ঘটনা নিয়ে উত্তাল হল সংসদ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে পারস্পরিক আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের উত্তাপ দেখলাম আমরা।

কিন্তু নারী সুরক্ষায় কোনও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে দেখা গেল না। প্রশ্ন উঠল অনেক। নিষ্ঠুর এ ঘটনার নিন্দা করলেন রাজনীতিকরা।

কিন্তু উপেক্ষিত রয়ে গেল নারী সুরক্ষার প্রশ্ন। সুবিচারের দাবিতে উত্তাল দেশে শেষপর্যন্ত এই ধর্ষণ কান্ডে অভিযুক্তদের এনকাউন্টার করে দেওয়ায় মানুষের ক্ষোভে প্রলেপ দেওয়া হল। ফলে চাপা পড়ে গেল নারী সুরক্ষার মতো গুরুতর প্রশ্নটি।

অন্যদিকে ধর্ষণ প্রতিরোধের কোনও পথ খুঁজলেন  না রাজনীতিকরা বা আইনজ্ঞরা।

প্রশ্ন উঠছে, কিভাবে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব? কড়া শাস্তির বিধান থাকলেই কি ধর্ষণ ঠেকানো যাবে? যেখানে এদেশে বিভিন্ন সময়ে নিজের সরকারের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে ধর্ষিতার চরিত্র থেকে তার পোশাক সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাজনীতিকরা?

শুধু তাই নয়, ধর্ষক দলের নেতা-কর্মী হলেই তাকে আড়াল করে রাজনৈতিক দল, সেখানে ধর্ষণের দায় কেবলমাত্র ধর্ষকের থাকে না, তা সমাজের উপরও বর্তায়। আবার এর দায় পরিবারেরও কিছু কম নয় বলে মত সমাজবিজ্ঞানীদের একাংশের।

তাঁদের মতে, সরকার, আইন বা  পুলিশি ব্যবস্থা দিয়েই ধর্ষণের মোকাবিলা সম্ভব নয়। পাশাপাশি এর মোকাবিলায় পরিবার এবং সমাজকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। বিশেষ করে একটি শিশু বেড়ে ওঠার সময় থেকেই তাঁকে নারীকে মানুষ হিসাবে পুরুষের সমান মর্যাদায় দেখার শিক্ষা দিতে হবে। নারীকে সম্মান জানানোর শিক্ষা দিতে হবে।

শৈশব থেকেই এভাবে শিক্ষা দিলে একটা সময় গিয়ে তা ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পাচিল তুলবে। সমাজেও ঠিক একই ভাবে নারীকে সম্মান জানানোর রীতি বাধ্যতামূলক করতে হবে।

পাশাপাশি আইনের চাপ এবং প্রশাসনের চাপও রাখতে হবে। ধর্ষণের অভিযোগকে জামিন অযোগ্য করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে দ্রুত বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা।

প্রতিটি থানায় ২৪ ঘণ্টার জন্য মহিলা সেল চালু রাখতে হবে। তবেই ধর্ষণের মোকাবিলা কিছু হলেও সম্ভব হতে পারে বলে মত তাঁদের।    

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here