সহেলী চক্রবর্তী

মাত্র সাড়ে ছয় মিনিটের ফোন কল। তারপর আর কোনো ভাবেই যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি তাঁর সঙ্গে।

প্রথম দুটি লাইন পড়ে আশা করি বুঝতেই পারছেন কোন বিষয় বা কার সম্পর্কে কথা বলছি। ২৬ বছর বয়সী ডঃ প্রিয়াঙ্কা রেড্ডি। পেশায় পশুচিকিৎসক।

যিনি অবলা পশুদের প্রাণ বাঁচানোর মহৎ পেশায় নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। তাঁকেই কিনা নিজের প্রাণ দিতে হল কতগুলো নরপিশাচের হাতে! ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস!…

তরুণীর বাবার কথায়, ২৭ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯ টা নাগাদ মেয়ের ফোন বন্ধ দেখ ভেবেছিলেন হয়ত চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছে। ঘড়ির কাঁটা রাত ১০ টা। তখনও দেখা নেই মেয়ের।

উৎকন্ঠা চেপে রাখতে না পেরে যে টোল প্লাজার কথা প্রিয়াঙ্কা শেষবার ফোনে তাঁর দিদিকে জানিয়েছিল সেখানে গিয়ে শুরু করেন খোঁজাখুঁজি। কিন্তু পাওয়া যায়নি।

আর কোনো রিস্ক না নিয়েই স্থানীয় থানায় ছুটে যান প্রিয়াঙ্কার বাবা। সেইসময় দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারকে জানিয়ে লাভ হয়নি কোনো।

ফের ছুটে যান অন্য একটি থানা। দুইজন কনস্টেবলকে খুলে বলেন সমস্ত ঘটনা।কিন্তু মেয়েকে বাঁচাতে চাওয়া বাবার আকুল আর্তিতে আমল দেননি তারাও। অগত্যা মেয়েকে বাঁচাতে ফের নিজেই নামেন রাস্তায়। চলে সারারাত খোঁজ….

টানা পাঁচ ঘন্টা পর অভিযোগ নেয় পুলিশ। ততক্ষণে সব শেষ।

বৃহস্পতিবার সকালে শাদনগরে আউটার রিং রোডের আন্ডারপাসের নীচে ধর্ষিতার পোড়া দেহাংশ মেলে। দেহাংশ উদ্ধারের ২৪ ঘন্টার মধ্যেই পুলিশি তৎপরতায় গ্রেফতার করা হয় চার অভিযুক্তকে। মহম্মদ পাশা, জল্লু শিবা, জল্লু নবীন এবং চিন্তকুন্ত চেন্নাকেশভুলু নামে এই চার জনই ট্রাকের কর্মী। জানা গেছে, প্রত্যেকের বয়সই ২০-২৬ এর মধ্যে।

অভিযুক্তদের জেরায় পুলিশের কাছে যে তথ্য উঠে এসেছে,

বুধবার সন্ধ্যা ৬টা। শামশাবাদ টোল প্লাজ়ায় তরুণী চিকিৎসককে স্কুটার রাখতে দেখেই তাঁকে ধর্ষণের ছক কষেছিল চার অভিযুক্ত।

সেখানে বসে মদ্যপান করছিল তারা। বাড়ি ফেরার পথে তরুণী ট্যাক্সি করে গোচিবাওলিতে এক চর্মচিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।

প্রিয়াঙ্কা চলে যেতেই স্কুটারের চাকা ফাঁসিয়ে দেয় অভিযুক্তদের একজন। তরুণী ফিরে আসার পরে অভিযুক্তরা বলে, চাকা তারা সারিয়ে দেবে।

এরপর ফের স্কুটার নিয়ে চলে যায় একজন। তখন বাকি তিন অভিযুক্ত টোল প্লাজ়ার কাছেই একটি ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে তরুণীকে।

আরও পড়ুনঃধর্ষণের বিরুদ্ধে রাজধানীর ফুটপাতে নীরব প্রতিবাদ তরুণীর

চাকা সারিয়ে ফিরে এসে ধর্ষণ করে আরও এক অভিযুক্ত। ঘটনার পর শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হয় ওই তরুণী চিকিৎসককে।

এর পরে স্কুটারটি নিয়ে কয়েক বোতল পেট্রল কেনা হয়। কিছুটা ডিজেল বার করা হয় তরুণীর স্কুটার থেকেও।

এর পরে আন্ডারপাসের এক কোণে দেহ নামিয়ে তেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে পালায় অভিযুক্তরা।

পরের দিন ভোরে এক দুধ-বিক্রেতা সেখানে দেহটি জ্বলতে দেখে পুলিশে খবর দেন।

প্রিয়াঙ্কা রেড্ডির মা জানিয়েছেন তিনি চান মেয়ের ধর্ষক খুনিদের জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হোক।

চরম নৃশংস ঘটনায় ক্ষোভের আগুনে ফেটে পড়েছে গোটা দেশ। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম – একবাক্যে সকলেই চান চরমতম শাস্তি হোক ধর্ষকদের।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছে কোটি কোটি প্রিয়াঙ্কা ও তাদের আত্মীয় পরিজনেরা। মোমবাতি মিছিলে শামিল হচ্ছেন অনেকেই।

কিন্তু কতদিন চলবে এইভাবে?

এই গোটা ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে পুলিশেরই ভূমিকা নিয়ে।

যে অঞ্চলে প্রিয়াঙ্কাকে ধর্ষণ করে খুন করা হল সেখানে সন্ধ্যের পর থেকে পুলিশ প্রহরার কথা থাকলেও সেদিন কেন কেউ ছিলেন না?

যখন তরুণীর বাবা থানায় থানায় ঘুরছিলেন তখন কেন অভিযোগ নেওয়া হল না?

উঠছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মানুষ বিপদে পড়ে সবার প্রথম থানার দ্বারস্থ হয়। কিন্তু বারবারই দেখা গেছে থানা অস্বীকার করে সমস্ত অভিযোগ নিতে। কিন্তু কেন?

যদি থানা সেই রাতেই তরুণীর বাবার অভিযোগ মোতাবেক কাজ শুরু করতেন তাহলে হয়ত এইভাবে মরতে হত না প্রিয়াঙ্কাকে।

ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি করেছেন তেলঙ্গানার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহম্মদ মাহমুদ আলি। তিনি বলেছেন, ‘‘ওই মহিলা শিক্ষিতা হয়েও পুলিশের ১০০ নম্বরে ফোন না করে কেন দিদিকে ফোন করলেন? তাতে হয়তো বেঁচে যেতেন।’’

তবে জনরোষের মুখে পড়ে বাধ্য হন নিজের বয়ান বদল করতে। বলেন, ‘‘ও আমার মেয়ে। গোটা রাজ্যের মেয়ে।’’ সঙ্গে ফের জুড়ে দেন—১০০-য় ফোন করলে তরুণী হয়তো বেঁচে যেতেন।

দিল্লিতে নির্ভয়া কাণ্ডের পর চালু হয় ‘নির্ভয়া হেল্পলাইন’ । ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপে যে নম্বরটি (৯৮৩৩৩১২২২২) দাবানলের মত শেয়ার হয়ে চলেছে আজও তদন্তে জানা গিয়েছে, তা চার বছর আগেকার একটি নম্বর।

২০১৮ সাল থেকে একেবারেই অচল তা। যখন চালু ছিল, তখনও সেটি কার্যকরী ছিল শুধুই মুম্বই শহরের জন্য।

তেলেঙ্গানার ঘটনার প্রেক্ষিতে কেন্দ্র সব রাজ্যকে ‘অ্যাডভাইসরি’ পাঠিয়ে মহিলাদের বিরুদ্ধে হিংসার ঘটনায় আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষণ রেড্ডি জানান, তেলেঙ্গানার প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তাঁরা।

প্রশ্ন উঠছে এখানেও। এই নির্দেশেই কী সব সমস্যার সমাধান লুকিয়ে রয়েছে? কেন কোন শক্ত আইন প্রণয়ন করা হবে না? যে দুটি থানায় তরুণীর বাবা মেয়ের প্রাণ বাঁচাতে ছুটি গিয়েছিলেন কেন তাদের শাস্তি হবে না?

এবার সরকারের তরফ থেকে নিহত প্রিয়াঙ্কার কিছু নামকরণ করা হবে, নির্ভয়া ২, কিংবা সাহসিনী বা অন্য কিছু।

পরিবারকে কয়েক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে| সঙ্গে পরিবারের একজনকে একটা চাকরি| সেই সঙ্গে নির্ধারিত হয়ে গেল একটি নারীর জীবনের দাম।

মানুষ দু চারদিন চা দোকানের বেঞ্চে বিপ্লব করবে, সোশ্যাল সাইটে জাস্টিসের পোস্ট ভরে উঠবে|

মোমবাতি ও ছবি নিয়ে চলবে প্রতিবাদী মিছিল।

ধীরে ধীরে এসব ঘটনা ভুলে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।বুক ফাটবে মৃত প্রিয়াঙ্কার মা-বাবা,পরিবারের|

আর পাঁচটা মেয়ের মতই নিজে কিছু করতে চেয়েছিলো সে|চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন| যাদেরকে বেশিরভাগ মানুষ উপেক্ষা করেন, গায়ে গরমজল ঢালেন, সেইসব অসহায় পশুদের বাঁচাতে চেয়েছিলেন পশু চিকিৎসক প্রিয়াঙ্কা|

হয়ত তিনি জানতেন, মানুষ বড়ই হিংস্র ও নিষ্ঠুর| তবে তাঁর বিশ্বাস ছিল কোনও পশু এমন নৃশংস হয়না|

আমরা লজ্জিত যে আমরা ডিজিটাল ইন্ডিয়ার গভীর পাঁকে এতটাই ডুবে গেছি যে পাশের অসহায় মানুষের আর্তনাদ দেখতে পাইনা।

টিকটক, পাবজি, সিওসির মত অনলাইন গেমস ও অ্যাপেই বীর সাজছি আমরা।

সত্যিই দেশ এগোচ্ছে। ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ বা ‘কন্যাশ্রী’ কোনোটাই যে মেয়েদের নিরাপত্তা নির্দিষ্ট করতে পারেনি তা স্পষ্ট।

আর কতদিন ?

যে দেশের সরকার আর বিরোধীরা মন্দির-মসজিদ তৈরীর তরজায় ব্যস্ত, তাদের সময় কোথায়? এনআরসি থেকে উচ্চতর স্ট্যাচু তৈরী, জিও ফ্রি থেকে আরও কত কিছু। এসবের মাঝে নারী সুরক্ষা,শিক্ষা,আর দোষীদের কঠিন সাজা দেওয়ার সময় কোথায়!

নির্বাচনে কে কটা আসন পেলো সেটাই আসল কথা। কয়েকদিন পরে এই নারকীয় ঘটনা পুরনো হবে|

কিন্তু থেমে যাবেনা| চলতেই থাকবে|

আবার কোনও মেয়ের যদি স্কুটি খারাপ হয় বা অফিস থেকে ফিরতে রাত হয়ে যায় …

….আবার একটা ব্রেকিং নিউজ, প্রতিবাদ, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় আরও কত কী!

থামবে কবে এই নৃশংসতা? ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা আদৌ কী কোনোদিন সরকার করবে? আদৌ কি সেই থানাদুটির কর্তব্যরত অফিসারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

এই প্রশ্নের স্থায়িত্ব কতদিন, সেটাই দেখার …

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here