সঞ্চারী পূততুন্ড, দ্য পিপল ডেস্ক : অবসাদ! খুব ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এর প্রভাব গভীর থেকে গভীরতর। কাজের চাপে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটে চলেছি আমরা সবাই।


নিজের কথা, পাশের মানুষটার কথা ভাবার সময়টুকুও যেন আজ নেই। হঠাৎ কিছু না পাওয়া, হারিয়ে ফেলা থেকে গ্রাস করছে অবসাদ।


এই অবসাদ একেক সময় প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। কিন্তু একটা ফোন, একটু আলিঙ্গন, আলতো হাসি মুহূর্তে বদলে দিতে পারে গোটা বিষয়টা।


পৃথিবী যেমন দ্রুত ঘুরছে সূর্যের চারদিকে, তার থেকেও দ্রুত ছুটে চলেছে মানব সমাজ। মাঝে করোনা এসে গোটা মানব সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

এই আচমকাই স্তব্ধতা অবসাদকে বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণ। মনের গভীরে ডুব দিয়ে তার তল খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। সবাই তা পারে না। যেমন পারেননি সুশান্ত!


খুব পজিটিভ মানুষও অবসাদের শিকার হন। তাঁর মনের ভিতরেও কোথাও লুকিয়ে থাকে যন্ত্রণা।


আশেপাশের মানুষগুলোকে শক্তি জোগাতে জোগাতে একসময় সে নিজেই নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন তাঁরও শক্ত হাত বা কাঁধের প্রয়োজন।


যেখানে সে নিজেকে নিশ্চিত ভাবতে পারে। ভবিষ্যতে নিজে এবং অন্যকে বাঁচানোর রসদ জোগার করতে পারে।


ছিছোড়ে’র অনিরুদ্ধ। পর্দায় আত্মহত্যা কোনও সমাধান নয়, এমন বার্তা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বাঁচতে হবে। লড়াই করতে হবে।


কিন্তু তিনি নিজেই চলে গেলেন লড়াইয়ের ময়দানে ছেড়ে। আজ তিনি পাড়ি দিয়েছেন ‘না ফেরার দেশে’।


কিন্তু এরকম তো হওয়ার নয়। নাম, যশ, অর্থ কোনও কিছুর অভাব নেই। প্রাণোচ্ছ্বল একটা জীবন এত দ্রুত শেষ হয়ে গেল। এটার পিছনেও রয়েছে গভীর অবসাদ।


ছয় মাস ধরে মানসিক সমস্যার চিকিৎসা চলছিল তাঁর। তাও কাজে এল না। অত্যন্ত পজিটিভ একটা মানুষ শেষ করে দিলেন নিজেকে।


আসলে এই অবসাদের কাছে অর্থ, প্রতিপত্তি, যশ, মর্যাদা, আভিজাত্য সবকিছুই হার মানে।


অবসাদই একটা মানুষকে আত্মহত্যাপ্রবণ করে তোলে। এই সুন্দর পৃথিবীর সব রূপ, রস, গন্ধ ভোগ করতে চায় সে।


কখনও সে চায় না পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে। একমাত্র প্রবল মানসিক অবসাদ বাধ্য করে নিজেকে শেষ করতে।


সেই মুহূর্তে তাঁর কাছে মৃত্যুটাই হয়ে ওঠে পরিতৃপ্তির জায়গা।


অনেকেই মন্তব্য করেন, এইটুকু বয়সে আবার অবসাদ কিসের? এখন তো লড়াই করার সময়। কিন্তু সেই লড়াইটাও অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।


আত্মহননকেই তখন একমাত্র মুক্তির রাস্তা মনে হয়। বাইরে থেকে মানুষের অন্তরের যন্ত্রণা বোঝা সম্ভব হয় না, তার সঙ্গে কিছুক্ষণ একান্তে আলাপ করলেই উঠে আসে হাজার চেপে যাওয়া যন্ত্রণার কথা।


আমাদের আশেপাশের এই অসহায় মানুষগুলোই মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করছে।


শারিরীক স্বাস্থ্য নিয়ে সকলে সচেতন। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য? শারীরিক অসুস্থ হলে তা চোখে পরে, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হলে তা চোখে ধরা পড়ে না।


শারীরিক রোগের থেকে অনেক বড় এই মানসিক অসুস্থতা। যা ধীরে ধীরে মানুষকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।


কারা দায়ী এই মৃত্যুর পিছনে? প্রত্যাশার পাহাড়ে চাপতে চাপতে কখন যেন নিজেকেই অচেনা, অজানা লাগে। তবে এর থেকে মুক্তি কিসে?


মুক্তি সব কিছুতেই রয়েছে, তবে তা পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করেই বের করতে হবে। নিজেকে শেষ করে শর্টকাট বাছলে হবে না। কথা বলতে হবে।


মনের তল পেতে হবে। আমাদের পাশের মানুষটার মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করতে হবে কতটা যন্ত্রণা জমে আছে সেখানে।

একটু কথা। একটু ভরসা। পরিস্থিতি বদলে দেয় অনেকটা। আত্মহনন এত সহজ নয়, তারজন্যও লড়াই করতে হয় নিজের মনের সঙ্গে। নিতে হয় মানসিক প্রস্তুতি।


সেই মূহূর্তে ‘সমস্যা কোথায়’, ‘চিন্তা নেই আমি আছি’,’পাশে আছি’, মানবিক কথা, মানবিকতা চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার থেকে সরিয়ে আনে।


সময়টা বড় কঠিন। কিন্তু এই কঠিন সময়ে বন্ধু-শত্রু সবাইকে পাশে নিয়ে চলতে হবে। লড়তে হবে কঠিন সময়ের বিরুদ্ধে। মানুষগুলোকে না হারিয়ে আমাদের হারাতে হবে এই পরিস্থিতিকে।