গৌতম ভট্টাচার্য

জানেন, ছেলেটা বাবার ভিডিওটা দেখে বাবাই, বাবাই করে!

চোখের জল মুছে আড়ষ্ট গলায় কথাগুলো বলছিলেন নিহত তৃণমূল নেতা সত্যজিত বিশ্বাসের স্ত্রী রূপালি। স্বামী নেই, তাই এবার অঞ্জলিও দেবেন না বছর ছাব্বিশের এই বিধবা।

নদিয়ার হাঁসখালির তৃণমূল নেতা সত্যজিত বিশ্বাস

সরস্বতী পুজোর আগের দিন সন্ধেয় ছেলে সৌম্যজিতকে কোলে নিয়ে পাড়ায় গিয়েছিলেন নদিয়ার হাঁসখালির তৃণমূল নেতা সত্যজিত।

বছর দেড়েকের ছেলেকে কোলে নিয়েই মোবাইলবন্দি করেছিলেন ঠাকুরের ছবি। মায়াবি মুহূর্তের ভিডিও-ও তুলে রেখেছিলেন।

আদুরে ছেলেকে পাড়ারই একজন কেলে নিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তেই আততায়ীর বন্দুকের গুলি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় সত্যজিতের বুক।

মাত্র দেড় বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিল সৌম্যজিত। আর পঁচিশ বছর বয়সে সিঁথির সিঁদুর মুছতে হয়েছিল রূপালিকে।

সত্যজিতকে দাহ করে ফেরার পর জোর করে শাঁখা ভেঙে দিয়েছিল পাড়ার ছেলেরা।

স্বামী হারানোর যন্ত্রণায় প্রলেপ দিয়েছিলেন তৃণমূল নেতারা। লোকসভা নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করে ঘাসফুল শিবির।

সেই ভোটে হেরে যান রূপালি। তার পর ছেলেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

পার্টি অন্ত প্রাণ ছিলেন সত্যজিত। মতুয়া সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। এলাকার উন্নয়নে নানা কাজ করেছিলেন।

প্রতিবাদ করতেন দুর্নীতির। তার পর পলাশপ্রিয়ার আরাধনার ঠিক আগের দিন আততায়ীর গুলিতে লুটিয়ে পড়েন কাজের ছেলে বলে খ্যাত সত্যজিত।

দলের ওপরতলার নেতারা তেমন খোঁজখবর নেন না

সত্যজিতের ঘনিষ্ঠরা এখনও নিয়মিত খোঁজ নেন। তবে দলের ওপরতলার নেতারা তেমন খোঁজখবর নেন না বলে রূপালির অভিযোগ।

এখনও অবশ্য সময় পেলেই দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দেন। ছেলে-সংসার সামলেই।

 একটি স্কুলে ক্লার্কের চাকরি করতেন সত্যজিত। স্বামীর সেই চাকরিটা পেয়েছেন। ছোট্ট সৌম্যজিতকে মায়ের কাছে রেখে স্কুলে চলে যান রূপালি।

টলোমলো পায়ে হাঁটতে শিখেছে সৌম্যজিত। বুলিও ফুটেছে আধো আধো। চিনতে শিখেছে ছবি।

মোবাইলে সত্যজিতের ছবিটা দেখে বাবাই, বাবাই বলে চিতকার করে। দু বছরের ছেলে কী আর বুঝতে পারে যে, ছবির বাবা আর কথা বলবে না কোনওদিন!

বাড়িতে এখনও ছেলেকে কোলে নিয়ে একটা ছবি রয়েছে সত্যজিতের। আলাদা ছবিও রয়েছে।

রয়েছে সৌম্যজিতের ছোটোবেলার নানা মুহূ্র্তের রঙিন ছবিও। সেসব দেখেও আনমনা হয়ে যায় ছোট্ট সৌম্যজিত।

এদিকে হাঁসখালির একটা পুজোর উদ্বোধন করতেন সত্যজিত। সত্যজিত নেই।

এবার সেই পুজোর উদ্বোধন করেন মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশে ছিলেন রূপালি। তবে দেবী মূর্তির পানে তাকাননি একবারও।রাগে নাকি ক্ষোভে।

গতবছরও সত্যজিতের কিনে দেওয়া নতুন শাড়িটা পরে অঞ্জলি দিতে গিয়েছিলেন রূপালি। এবার শাড়ি কেনেননি।

অঞ্জলিও দেবেন না। কী হবে? যাঁর মঙ্গলের জন্য এসব করা, তিনিই তো আর নেই, অস্ফুটে বলেন রূপালি।

কচি কচি হাতে মায়ের চোখের জল মুছে দেয় ছোট্ট সৌম্যজিত।

তড়িঘড়ি ছেলেকে কোলে তুলে নেন।কথার খেই হারিয়ে যায়। সামনের গাছটায় বসা পাখি ডেকে ওঠে, বউ কথা কও…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here