এক দেহ পশারিণীর জবানবন্দি

পুজোর কথা আর কি বলব, স্যর! আমাদের তিন ভাইবোনকে রেখে বাবা চলে গেলেন এক অষ্টমীর সকালেআমিই বড়। বয়স পনের। তার পরে বোন। তারও পরে ভাই। বাবা কাজ করতেন একটা ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশের দোকানে। কতটুকুই বা রোজগার! তাই সঞ্চয় বলতে কিছু ছিল না।

বাবা যেদিন মারা গেলেন, সেদিন ছিল অষ্টমী। আমার অসুস্থ বাবাকে খাইয়ে-দাইয়ে মা গিয়েছিলেন ভট্টাচার্যদের বাড়িতে, মা দুর্গাকে অঞ্জলি দিতে। হার্টের রোগী বাবার আয়ু কামনা করতে। আরও কটা দিন বেশি বাঁচলে মায়ের আমার আরও কটা দিন সিঁদুর পরা হবে। আরও কটা দিন সংসারের জোয়াল ঘাড়ে এসে পড়বে না।

মায়ের প্রার্থণা পূরণ করেননি মা দুর্গা।অঞ্জলি সেরে বাড়ি ফিরে বাবার মাথায় মা ছুঁইয়ে দিলেন প্রসাদী ফুল। মায়ের চাঁদপানা মুখটার দিকে এক ঝলক তাকিয়েই চোখ বুজলেন বাবা।চিরতের। হাউহাউ করে কাঁদতে থাকলেন মা। আমরাও। সেদিনই বুঝে গেলাম, আমাদের কপালে অশেষ দুঃখ রয়েছে।

দাহ কাজ করে ফিরলাম। ভাই ছোট বলে মুখাগ্নি করলাম আমিই। শ্রাদ্ধ পর্ব শেষ করে কীভাবে সংসার চলবে ভাবছি, এমন সময় বাড়িতে এলেন মণিমাসি। মাকে বললেন, মেয়েকে কলকাতায় পাঠিয়ে দাও। চাকরি করে পয়সা আনবে। বছর পনেরর একটা মেয়ে কী চাকরি করবে, কলকাতাই বা চিনবে কী করে, সেসব প্রশ্ন করেছিলেন মণিমাসিকে। মাকে অভয় দিয়ে তিনি বললেন, ওসব চিন্তা করো না বউমা, আমি তো রয়েছি।

অল্প বয়স থেকে কলকাতায় থাকায় মণিমাসির ওপর আমাদের গ্রামের সবাই ভরসা করত। বিয়ের পরে পরে মণিমেশোর সঙ্গে কলকাতায় চলে এসেছিলেন মাসি। মেশো মারা যাওয়ার পর মাসিই সংসার টানছেন। মাসির এখন কত্তো টাকা!

মাসির সঙ্গে চলে এলাম কলকাতায়। মাসি আমায় নিয়ে এলেন সোনাগাছিতে। তুলে দিলেন অন্য এক মাসির হাতে। শুরু হল আমার নতুন জীবন।

মাস ছয়েক ধরে মগজ ধোলাই করে আমার নতুন মাসি বুঝিয়েছে, বাঁচাটা বাঁচার মতো হওয়া চাই। বুঝিয়েছে, পুরুষের কাছে জামাকাপড় খুললে ক্ষতি কিছু হয় না, বরং লাভ হয়। শরীরটাকে ভোগ করে পুরুষ। বিনিময়ে মেলে টাকা শরীর পছন্দ হলে মেলে মোটা অংকের বকশিসও

এমনি এক অষ্টমীর দিন দুপুরে আমার ঘরে এলেন বছর চল্লিশের এক বাবু। আমার ষোড়শী শরীর নিয়ে করলেন খেলা। শরীর পছন্দ হওয়ায় মিলল হাজার টাকা বকশিসও।আমার জীবনের প্রথম রোজগার।মণিমাসি মারফত সেই টাকা পাঠিয়েছিলাম মাকে।দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক অখ্যাত গাঁয়ে বসে আমার গেঁয়ো মা কিছু না বুঝেই সেবার পুজোয় খরচ করেছিলেন হাত খুলে। তার পর থেকে এখনও প্রতি মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাই। বাড়ি যাই ন মাসে ছ মাসে। আমার গাঁয়ের সরল সাদাসিধে মানুষগুলো ভাবেন আমি কলকাতায় ভালো চাকরি করি। কী চাকরি করি, তা অবশ্য কেউ জানে না।

ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে ভট্টাচার্য বাড়িতে যেতাম অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে। যেবার বাবা মারা গেলেন, কেবল সেবারই যাইনি। বাবার কাছে আমাকে বসিয়ে রেখে মা গিয়েছিলেন। তার পর থেকে অষ্টমীর অঞ্জলি আর দেওয়া হয়নি আমার। এর কারণ দুটো।

এক পুজোর সময় প্রচুর খদ্দের আসে। তাই রোজগার ভালো হয়। আমার শরীরটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায় তারা। তাই দিনভর খাটাখাটনির শেষে ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিই সোনাগাছির চিলতে ঘরের ছোট্ট খাটিয়ায়।

অঞ্জলি না দেওয়ার দ্বিতীয় কারণটি বড় অদ্ভুত। আমি দেহ পশারিণী। আমার দেওয়া ফুল-বেলপাতা কী মা নেবেন? বেশ্যাদ্বারের মৃত্তিকা ছাড়া মায়ের পুজো হয় না। অথচ বেশ্যার দেওয়া অঞ্জলিতেই যত পাপ!

এই যে শরীর বেচে আমাদের সংসারটা একটু ভালোভাবে চলছে, এই ভাইটা, বোনটা পড়াশোনা করছে, এতেও পাপ! বছর পনেরর মাধ্যমিক পাশ না করা একটা মেয়ে আর কীই বা করতে পারত সংসারের জোয়ালটা টানতে!

জগজ্জননী কি এটাও বুঝবেন না! তাহলে তিনি কেমন মা!  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here