..সঞ্চারী পূততুন্ড..

ঘটনা ১: তেলেঙ্গানা থেকে ছত্তিশগড়ের বিজাপুরে নিজের বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল বছর বারোর জামলো মকদম। টানা তিনদিন ধরে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দেড়শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিল সে। কিন্তু না। শেষ পর্যন্ত বাড়িতে পৌঁছয়নি সে। পৌঁছে ছিল তার নিথর ছোট্ট শরীর। প্রবল খিদে ও তৃষ্ণায় ছোট্ট প্রাণবায়ু উড়ে গিয়েছিল। বাড়ি থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে মারা যায় জামলো।

ঘটনা ২ : একপ্রকার বাধ্য হয়ে মধ্যপ্রদেশের ঔরঙ্গাবাদ থেকে রেললাইন ধরে হাঁটতে শুরু করেছিলেন জনা কুড়ি শ্রমিক। সঙ্গে ছিল কয়েকটি শুকনো রুটি ও চাটনি। ট্রেন লাইন ধরে গেলে পথ চিনতে সুবিধা হবে, সেই আশাতেই হাঁটছিলেন তাঁরা। ভাবতেও পারেননি সামনেই তাদের জন্য ওঁৎ পেতে আছে মৃত্যু। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসায় ক্লান্ত হয়ে রেললাইনে শুয়ে পড়েছিলেন তাঁরা। ক্লান্তিতে চোখ লেগে এসেছিল। নিশ্চিন্ত ছিলেন ট্রেন লাইন তো কি হয়েছে, ট্রেন তো আর চলছে না। তাই বিপদটা বুঝতে পারেননি। ঘুমের ঘোরেই মালগাড়ির চাকায় পিষ্ট হলেন ১৬ জন শ্রমিক। বাকি চারজন চেষ্টা করেও তাঁদের বাঁচাতে পারেননি। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি মুহুর্তে লাঘব করে দিল মালগাড়ির চাকা। রেলে ট্রাকে পড়ে রইল শ্রমিকের ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া দেহ, রুটি আর চাটনি।

ঘটনা ৩ : একই রকমভাবে পাঞ্জাব থেকে বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছিলেন জনা দশেক শ্রমিক। বহু পথ পেরিয়ে রাতের অন্ধকারে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন তাঁরা। তাই পথের ধারে একটু জিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন অসহায় শ্রমিকের দল। কিন্তু সেই জিরিয়ে নেওয়ার আশাই কাল হল তাঁদের। মুজাফফরনগর-সাহারানপুর হাইওয়ের ওপর একটি বাস দ্রুতগতিতে তাঁদের পিষে দেয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ছয়জনের। আহত ৪ জন। অন্যদিকে, এই একইদিনে বাড়ি ফিরতে গিয়ে মৃত্যু হয় আট শ্রমিকের। এদের ট্রাকে করে বাড়ি ফেরার সৌভাগ্য হয়েছিল। কিন্তু সৌভাগ্য মুহূর্তে দুর্ভাগ্যে পরিণত হয়। একটি বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষে মৃত্যু হয় আটজনের। আহত হন ৫০ জন।

ঘটনা ৪: উত্তরপ্রদেশের আউলিয়ার মিহাউল গ্রাম। দুটি ট্রাকের সংঘর্ষে প্রাণ গেল ২৫ জন শ্রমিকের। জখম কম করে ৩০জন। ঘটনাচক্রে এদিন ছিল মোদি সরকারের ষষ্ঠ বর্ষপূর্তি। ২৫ জন শ্রমিকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোশাল সাইটে বিজেপি সেই সময়ই প্রকাশ করে একটি ভিডিও, ‘ছয় সাল বেমিসাল’।

উপরিউক্ত ঘটনাগুলি শুধুমাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনা। করোনা আবহে এটাই অসহায় শ্রমিক থুড়ি পরিযায়ী শ্রমিকদের নিত্যকাহিনি। কিন্তু প্রশ্ন, তাঁরা কি সত্যিই পরিযায়ী? ওঁরা সবাই এই দেশের নাগরিক। নিজ রাজ্যে কাজের জোগাড় না পেয়ে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছিলেন। আচমকা লকডাউনে সেখানেই আটকে পড়ে রুজি-রুটি হারিয়ে শুরু হয় সমস্যা। তাতেই বদলে গেল পরিচয়। ওঁরা হলেন পরিযায়ী।

কেউ কি ভেবেছেন এই অসহায় শ্রমিকদের কথা? এঁরা বাড়ি ফিরবেন কি করে? কি খাবেন? কোথায় থাকবেন? ভেবেছেন অনেক পরে। ততদিনে বহু শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, নাহলে সংক্রমিত হয়েছেন মারণ রোগে। সেইসব ঘটনার সবটা হয়তো সংবাদমাধ্যমে উঠে আসেনি। পেটে ভাত নেই, পকেটে পয়সার টান, লকডাউনের কারণে চলছে না কোনও গণপরিবহন, তাই ভরসা দু’পা।

এতে ভর করেই হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। কেউ জঙ্গলের পথে, কেউবা রেললাইনে, কেউ হাইওয়ে ধরে ফিরতে চাইছেন নিজের জন্মভিটেতে, পরিবারের কাছে। বাড়ি ফিরতে চেয়েও বাড়ি ফেরা হয় না বহু শ্রমিকের। বাড়িতে অপেক্ষা করে পরিবার। খবর আসে মৃত্যুর। শূন্য দৃষ্টি নিয়ে আশায় বসে থাকেন তাঁরা।

জামলো মকদম। বছর বারোর শিশু শ্রমিক। সংসারের অনটনে বাধ্য হয়ে তেলেঙ্গানার কান্নাইগুড়া গ্রামে লঙ্কাক্ষেতে কাজ করতে যায় মা, বাবাকে একটু সাহায্য করতে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে, লঙ্কাক্ষেতটা কি জামলোর আসল জায়গা? এই বয়সটা তো খেলে বেড়াবার বয়স। পড়াশোনা করে স্বপ্ন বোনার বয়স। কিন্তু এই বয়সেই সংসারের দায় নিজের কাঁধে চাপিয়ে নিয়েছিল সে। লকডাউনের মেয়াদ বাড়তেই বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছিল। বাড়ি ফিরতে চেয়েও তার বাড়ি ফেরা হয়নি। বাড়ির ঠিক ১৪ কিলোমিটার আগে নিভে গিয়েছিল ছোট্ট শিশুটির জীবনপ্রদীপ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আর টিভির পর্দায় দুঃখ প্রকাশ করে বা সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়েই ক্ষান্ত হয় সরকার। এরপরে কি মূল সমস্যার সমাধান হবে? ক্ষতিপূরণের টাকায় কি শ্রমিকের জীবনের ক্ষতিপূরণ মিটবে? প্রতিনিয়ত প্রতিমুহূর্তে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন এই অসহায় শ্রমিকরা।

শীতকালে সুদূর সাইবেরিয়া সহ বিদেশ থেকে ডানায় ভর করে ভারতে আসে পরিযায়ী পাখিরা। নির্দিষ্ট ঘর বাড়ি না থাকায় তারা পরিযায়ী। কিন্তু এই অসহায় শ্রমিকরা এই দেশেরই নাগরিক। জীবিকার তাগিদে অন্য রাজ্যে বসবাস করেন। তাই আজ তাঁরা নিজ ভূমেই পরবাসী।