দিলীপ রায়

আফরাজুল থেকে পাঁচ বাঙালি শ্রমিক। অব্যাহত পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যু মিছিল। নিন্দা, ক্ষতিপূরণ, শোকপ্রকাশ, সমবেদনা, মোমবাতি মিছিল প্রত্যক্ষ করছি আমরা। জীবনহানি নিয়ে রাজনীতি, শাসক-বিরোধী চাপানউতোরও চলছে। গরমাগরম টক শো জমিয়ে তুলছেন রাজনীতিকরা।

শোকপ্রকাশ, সমবেদনা, ক্ষতিপূরণ সবই পেয়ে যাচ্ছেন মৃতের পরিবার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিপূরণের পরিমাণও বাড়ছে।কিন্তু সুবিচার কি পাচ্ছেন মৃতের পরিবার? প্রশ্ন উঠছে।

প্রশ্ন উঠছে,  এই মৃত্যুর দায় তবে কার?

কাশ্মীরে সন্ত্রাস হামলায় পাঁচ শ্রমিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সপাটে দায় চাপিয়েছেন কেন্দ্রের ঘাড়ে।

অন্যদিকে, এই শ্রমিকদের বাইরে কাজ করতে যাওয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ। রাজ্যে কাজ না থাকাকে কারণ উল্লেখ করে এর দায় চাপিয়েছেন রাজ্যের ঘাড়ে।

আর প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র এই মৃত্যুর দায় রাজ্য এবং কেন্দ্র দুই সরকারের ঘাড়েই চাপিয়েছেন। বামেরাও কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ের উপর দায় চাপিয়ে এখনও মমতার সরকার কেন পরিযায়ী শ্রমিকদের ডেটা ব্যাঙ্ক তৈরি করেনি, সে প্রশ্ন তুলছে।

এভাবেই পারস্পরিক দায় চাপানোর খেলায় এখন সরগরম রাজ্য রাজনীতি।

আরও পড়ুনঃ পরিচিতি হারিয়ে বিষন্ন কাশ্মীর, মোগাম্বো খুশ

মমতার প্রশ্ন, জম্মু-কাশ্মীরের প্রশাসনিক দায়িত্ব এখন পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, তা সত্ত্বেও কীভাবে বাংলার পাঁচ শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করা হল?

ঘটনার দিন জম্মু-কাশ্মীর পর্যবেক্ষণে থাকা ২৩ জনের ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের জন্য কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও এত বড় ঘটনা কীভাবে ঘটে যেতে পারে?

মৃতদের পরিবার পিছু ৫ লক্ষ টাকা করে অর্থ সাহায্য ঘোষণা করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পনা মাফিক পাঁচ শ্রমিককে খুন করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন তিনি। প্রশ্ন তুলেছেন জম্মু-কাশ্মীরের আইন-শৃঙ্খলা নিয়েও।

অন্যদিকে, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র বলেছেন, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে মালদার শ্রমিক আফরাজুল খান রাজস্থানে খুন হয়েছিলেন। তখন থেকেই আমরা রাজ্য সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছিলাম, বাংলার শ্রমিককে অন্য রাজ্যে কাজের খোঁজে যেন যেতে না হয়। কেন বাংলায় পর্যাপ্ত কাজ থাকবে না?

মানুষ একসময় রুটি-রুজির জন্য বাংলায় আসতেন। তাঁর প্রশ্ন, কেউ দেখেছেন মহারাষ্ট্র, গুজরাত, রাজস্থান বা দক্ষিণ ভারত থেকে এসে কোনও শ্রমিক বাংলায় কাজ করছেন? রাজ্যে পর্যাপ্ত কাজ না থাকার প্রশ্ন তুলেছেন দিলীপও ঘোষও।

পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিক আফরাজুলকে পিটিয়ে পুড়িয়ে মারার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরও রাজনীতিকরা সোচ্চার হয়েছিলেন। কিন্তু অভিযুক্ত এখনও শাস্তি পায়নি। উলটে অভিযুক্তকে সংবর্ধনা দিয়েছে কেন্দ্রের শাসকদলের কর্মীরা।

কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হামলায় পাঁচ বাঙালি শ্রমিকের মৃত্যুর পর তাঁর দায় নিয়ে আকচাআকচির মধ্যে ফের উঠে এসেছে আফরাজুলের নাম। কিন্তু তাঁর পরিবার যে সুবিচার পায়নি, সে প্রশ্ন তোলেননি কেউ-ই।

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নও তোলেনি কোনও রাজনৈতিক দল। রাজ্যের বাইরে কাজে যাওয়া নিয়ে রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছে বিরোধীরা।কিন্তু প্রকৃত তথ্য অন্য চিত্র তুলে ধরছে।

আরও পড়ুনঃ প্রসঙ্গ জিয়াগঞ্জ হত্যাকাণ্ড : উধাও মানবিকতা, সঙ্কটে রাজনীতি

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দিল্লিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গৃহকর্মী, গুরগাওতে ট্যাক্সি কোম্পানির ড্রাইভার, কেরলে নির্মাণ কর্মী এবং পাঞ্জাবে কৃষিকাজ অনেকটাই পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর নির্ভরশীল। আধুনিক শহর গড়ে ওঠায় বিরাট ভূমিকা রয়েছে পরিযায়ী নির্মাণ শ্রমিকদের।

এদেশে প্রায় ১৪ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছেন। মূলত এরা মরশুমি, আংশিক সময়ের বা  পুরো সময়ের হন। চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ঠিকাদারের হাত ধরে নিজের রাজ্যের ভিতরে বা ভিন রাজ্যে কাজ করতে যান। সস্তা শ্রমের বিনিময়ে তাঁদের খাটিয়ে নেওয়া হয়।

এই শ্রমিকদের কাজের যেমন নিরাপত্তা নেই, ঠিক তেমনই কোনও রকম সুরক্ষা নেই। মজুরি থেকে বঞ্চিত করলেও নালিশ জানানোর কোনও জায়গাও নেই।পেটের তাগিদে ভিন রাজ্য কাজে যুক্ত থাকার ফলে ভোটার হিসাবেও এদের মূল্য থাকে না। যার ফলে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর সুযোগ থেকেও এই শ্রমিকরা বঞ্চিত।

ট্রেড ইউনিয়ান নেই। অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলে না কোনও ট্রেড ইউনিয়ান-ই। এদের সুরক্ষায় কেন্দ্র বা রাজ্যের কোনও আইনও নেই। নেই কোনও পরিকল্পনাও। কোন রাজ্যের কত শ্রমিক কোথায় কোন সংস্থায় কাজ করছে, সে তথ্যও কোনও প্রশাসন রাখে না। ফলে এরা মরে।

প্রায় প্রতিদিনই একটু একটু করে মরে। রোগে মরে, আত্মঘাতী হয়, খুন হয়। কেউ খোঁজ রাখে না। আফরাজুলের মতো হিন্দুত্ববাদের আক্রমণে মরলে বা পাঁচ বাঙালি শ্রমিকের মতো সন্ত্রাস হামলায় মরলে এরা মহান হয়ে ওঠে। ভোট রাজনীতির কাছে কিছু সময়ের জন্য দামি হয়ে যায়। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। চাপা পড়ে যায়।

আর আফরাজুলের খুনি দাপিয়ে বেড়ায়। উপত্যকায় বেড়ে চলে সন্ত্রাস হামলা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়েন দেশনেতারা। কিন্তু মরতেই থাকে পরিযায়ীরা। ফলে রাষ্ট্র বা রাজনীতিকরা এইসব শ্রমিকদের মৃত্যুর দায় কি এড়িয়ে যেতে পারে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here