||দিলীপ রায়||

সারা বাংলা যখন শারদ উৎসবে মাতোয়ারা, আকাশ বাতাস ঢাকের শব্দে মুখরিত, ঠিক তখন মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে নৃশংস এক হত্যাকাণ্ডের খবর ব্রেকিং নিউজ হল। দশমীর দিন বাড়িতে ঢুকে দুষ্কৃতীরা খুন করল শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল ও তাঁর অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী এবং আট বছরের শিশু পুত্রকে।

দশভুজার বিদায় লগ্নে মাতোয়ারা বাঙালির সিঁদুর খেলা তখন টিভির পর্দায় ভেসে উঠছে। চ্যানেলে চ্যানেলে চলছে পুজো মণ্ডপ আর সিঁদুর খেলা দেখানোর প্রতিযোগিতা।রাজ্য জুড়ে ঢাকের শব্দ, মাইকের আওয়াজ, ধুপের গন্ধ, হৈ-হুল্লোর আর ফুর্তির ফোয়ারায় হারিয়ে গেল আস্ত একটা পরিবার হত্যার খবর।

আর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল দুর্গা কার্ণিভালের।নিউজ ব্রেকিং-এ তখন একমাত্র কার্ণিভালের প্রস্তুতি।

পরদিন দিল্লিতে আরএসএসের এক নেতা বিবৃতি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি করলেন। নিহত শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পালকে আরএসএসের দীর্ঘদিনের কর্মী বলে দাবি করে তিনি বললেন, বাংলায় একের পর এক আরএসএস কর্মীকে খুন করা হচ্ছে। এই কারণে কেন্দ্রের রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা উচিত।

পাশাপাশি, জাতীয় মহিলা কমিশনের  চেয়ারপার্সন রেখা শর্মা এ ঘটনার তদন্তের দাবি করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখবেন বলে সংবাদমাধ্যমকে জানান।

এদিকে রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ও এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খোলেন। তিনি বলেন,এ ঘটনায় তিনি গভীর ভাবে মর্মাহত। এই হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত করার জন্য রাজ্য প্রশাসনের কাছে আর্জি জানান রাজ্যপাল। তাঁর দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের  পর দীর্ঘ সময় কেটে গিয়েছে। কিন্তু প্রশাসন বা সরকারের তরফে এনিয়ে কেউ কোনও কথা বলেনি। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

রাজ্যপালের এই বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় পালটা আক্রমণ করেন রাজ্যপালকে। তিনি বলেন, রাজ্যপাল রাজনৈতিক নেতার মতো কথা বলছেন। তাঁর কথায়, রাজ্য জুড়ে এত বড় একটা উৎসব, সম্প্রীতির-সৌহার্দ্যের উৎসব শান্তিপূর্ণ ভাবে হয়েছে। সেটা রাজ্যপালের চোখে পড়েনি।

একটা পারিবারিক ঝামেলা নিয়ে এত অপপ্রচার কেন প্রশ্ন তুলে পার্থ চট্টোপাধ্যায় আরও বলেন, রাজ্যপালের বক্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অভিসন্ধিমূলক। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ত্রিপুরায় অরাজকতা চলছে। তিনি বরং সেদিকে নজর দিন।

অন্যদিকে, শনিবার মেয়ো রোডে এই হত্যকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখায় বিজেপি। বন্ধুপ্রকাশ পালকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করে গেরুয়া শিবির।

রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিজেপি। গত বুধবার এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানান রাহুল সিনহা। এদিন মেঘালয়ে রাজ্যপাল তথাগত রায়ও এ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এত প্রতিবাদের পরও মানবিকতার খোঁজ মেলে না রাজনীতিতে। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি তাই দখলের ফিকিরই খুঁজে চলে।জীবিত বা মৃত মানুষের দখল নিয়েও চলে রাজনৈতিক দলের দড়ি টানাটানি।

নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ বা নিন্দার সময় প্রধান হয়ে যায় রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রশ্ন। উপেক্ষিত হয় তদন্তের দাবি, দোষীদের শাস্তির দাবি। আবার রোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনাও সহ্য  করতে পারে না শাসকদল।

এটুকু সাহস করে বলতে পারে না যে, নিষ্ঠুর এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে। এমনই দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে রাজনীতি। উধাও হয়ে গিয়েছে মানবিকতা।

পুনশ্চ : জিয়াগঞ্জ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে এখনও পর্যন্ত দু’জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে গিয়েছে সিআইডি। যতদূর জানা গিয়েছে, বন্ধুপ্রকাশ পাল গত ছ’মাস আগে আরএসএসে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বিজেপি কর্মী নন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তিনি রাজনীতি করতেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here