||শুভজিৎ চক্রবর্তী||

আমাদের WHATSAPP গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন: Whatsapp

১৪ ফেব্রুয়ারি। ভ্যালেন্সটাইন ডে। সেই সঙ্গে হাড় হিম করা ঠান্ডা দিল্লির বুকে। দিল্লির লালাকেল্লার সামনে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ততক্ষণে দেশজুড়ে সবথেকে বড় ঘটনা ঘটে গিয়েছে। পুলওয়ামায় প্রায় ৪০ জনের বেশী জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় হতে শুরু করেছে গোটা দেশ। ঠান্ডা হাওয়ার হু হু শব্দ যেন জানান দিচ্ছে গোটা দেশ কাঁদছে।

একরকম চ্যালেঞ্জ নিয়েই বেড়িয়ে পড়েছিলাম উপত্যকার উদ্দেশ্যে। পরের দিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল দেখলাম বাস তখন কাঠুয়া পৌঁছেছে। মোড়ে মোড়ে কড়া নিরাপত্তা। শেষমেশ সকাল ১০ টা নাগাদ একের পর এক নিরাপত্তার কড়া বেষ্ঠনী পেরিয়ে পৌঁছলাম জম্মু শহরে। সে এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা।

কিছুদুর যাওয়ার পরে আটকে দেওয়া হল বাস। যেখানে আমাদের নামানো হয়েছিল সেখান থেকে হোটেলের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। রয়েছি ৩ জন। আমি, আমাদের নিউজ হেড নয়ন রায়, সহকর্মী মিমো অধিকারী। কোনও অটো হোটেলের দিকে যেতে রাজি নয়। অগত্যা হাঁটা পথেই পাড়ি দিলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। প্রায় কিলোমিটার খানেক হাঁটার পর দেবদূতের ন্যায় হাজির হলেন এক অটোচালক। নাম পবন সিং। কলকাতা থেকে এসেছি শুনে বিপদের সময় কিছুটা সাহায্য করতে চাইলেন তিনি। অবশ্য তা শর্তসাপেক্ষে। শর্ত হল, উনি যতদূর সম্ভব নিয়ে যাবেন বাকিটা আমাদের ফের পায়ে হেঁটেই যেতে হবে। উপায় যখন একটাই সেটাই অবলম্বন করা হোক।

নিজের জীবনের সঙ্গে এই তিন অপরিচিতের জীবনের বাজি রাখলেন পবন সিং। কিছুদুর এগোতেই চক্ষু চড়ক গাছ। শহরের একাধিক জায়গা থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে আসছে কালো ধোঁয়া। গোটা আকাশটা যেন চলে গিয়েছে ধোঁয়ার গ্রাসে।

একবার মনেও হয়েছিল কেন যে এলাম! কিন্তু তখন তো চ্যালেঞ্জ অ্যাক্সেপ্টেড। দূর থেকে পাথর ছোঁড়া হতে পারে আমাদের উপর, তা আন্দাজ করেছিলেন পবন সিং। যদি তাকে জেমস বন্ড বলি, তাও কম হবে। বিদ্যুৎ গতিতে অটো ঘুরিয়ে অন্য রাস্তা ধরলেন তিনি। গলির মধ্যে দিয়ে গেলে বিপদ কম। তাই সেটা দিয়েই আমরা এগোচ্ছিলাম হোটেলের দিকে।

কিছুদুর গিয়ে তাওয়ি নদীর ব্রিজের কাছে আমাদের নামিয়ে দিলেন পবন সিং। অসম্ভব সুন্দর নগরী। কিন্তু বিপদের লাল রেখা যে ক্রমশ অতিক্রম করছিলাম তা পবন সিংয়ের আকার ইঙ্গিতে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম।

রাস্তা দিয়ে যেতে গিয়ে যা দেখলাম তা, যে কোনও রোমাঞ্চ উপন্যাস এবং থ্রিলার মুভির থেকে নেহাত কম কিছু নয়। কাতারে কাতারে যুবক যুবতী রাস্তায় নেমে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষের প্রতিবাদের সুর জম্মুর নিস্তব্ধতাকে এক লহমায় ভেঙে দিয়েছে। শুধুমাত্র একটাই শব্দ সারা জম্মু আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে,‘হিন্দুস্থান জিন্দাবাদ/ পাকিস্তান মুর্দাবাদ’।

ততক্ষনে ফোনের নেটওয়ার্ক চলে গিয়েছে। বিপদের মধ্যে আরও এক বিপদ। যোগাযোগ বন্ধ। ফেরার কোনও রাস্তা নেই। প্রায় ৪ কিলোমিটার হেঁটে পাহাড়ের গা বেয়ে দেখা মিলল হোটেলের। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু না, চ্যালেঞ্জ এখনও বাকি। 

কারণ আমাদের যাওয়ার কথা ছিল পুঞ্চের সুরানকোটে। পাক সীমান্ত থেকে মাত্র ২০০ মিটারের দুরত্বে যাওয়ার কথা আমাদের। সেখান থেকে আমরা যাব জিরো পয়েন্টে। হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হলাম। দুপুর ২ টো নাগাদ হোটেল থেকে বেরোলাম বাইরের পরিস্থিতি বুঝতে। হোটেল থেকে বাইরে পা রাখতেই বুঝলাম জারি ১৪৪ ধারা। সেইসঙ্গে কার্ফু। টহল দিচ্ছে পুলিশের গাড়ি। মাইকিং করে জানান দেওয়া হচ্ছে, যে যার জায়গায় ফিরে যেতে। যদি কাউকে বাইরে দেখতে পাওয়া যায়, তাহলেই তার বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নিতে পারে পুলিশ।

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই বেরোলাম। কারণ সাংবাদিকতা শব্দটাই রোমাঞ্চ খুঁজে বেড়ায়। কিছুদুর এগোতেই দেখলাম প্রায় ১৫ জনের একটি গ্যাঙ আতি দ্রুত গতিতে বাইক নিয়ে এগিয়ে আসছে। হৃদস্পন্দন ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে। জম্মুর সেই ভয়ানক অভিজ্ঞতার চিত্র ক্যামেরাবন্দী করতে ফোন বার করলেন নয়নদা। মুহূর্তের মধ্যে তাদের কড়াদৃষ্টিতে পড়ে যাই আমরা। ঘিরে ধরা হয় আমাদের। তাদের কারোর হাতে ধারালো অস্ত্র। কারোর হাতে রড। কটুক্তিতে বাদ গেল না কেউই। হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ভাঙতে গেল তাদেরই একজন। কিন্তু আটকে দিল তাদেরই দলে থাকা একজন। বলল আপাতত ডিলিট করে ফোন ফিরিয়ে দিতে। ভিডিও ডিলিট করে ফোন ফিরিয়ে দিয়ে বিদ্যুতের গতিতে চলে সেখান থেকে চলে গেল তারা। যাক বাবা। ‘আপাতত’ রেহাই।

আগেই বলেছি, আমাদের যাওয়ার কথা ছিল সুরানকোট। তাই হাঁটা দিলাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে। কিন্তু আবারও বাধা। এবার নিরাপত্তারক্ষীদের ঘেরাটোপে আটকে পড়লাম। ব্যাগ সার্চ করতে চাইলেন একজন। আমাদের দেখে দূর থেকে হাজির হলেন অফিসার। কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপের পর একে অপরের দিকে তাকিয়ে বললেন “স্যার জি কাঁহা ভেজে ইনকো?” উত্তর এল, “কাঁহা ভেজনা হ্যায়, জাঁহা সে আয়ে ওহি লট জাঁয়ে”। চ্যালেঞ্জ আন অ্যাকসেপটেড। অগত্যা ফিরে গেলাম হোটেলে।

তারপর থেকে টানা দু’দিন হোটেলেই বন্দি ছিলাম আমরা। বেরোবার কোনও রাস্তা ছিল না। যোগাযোগের একমাত্র রাস্তা ছিল হোয়াটসঅ্যাপ। একদিন থাকার পর একপ্রকার মনের জোর নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। যেতে হবে জম্মু স্টেশন। হোটেল থেকে বেরিয়ে কিছুদুর এগোতেই পুলিশ চেকিং এর সামনে আটকে পড়লাম। যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ। সাহায্য চাওয়া হল ওখানকার এক অফিসারের কাছ থেকেই। রাজি হলেন তিনি। গাড়ি আসতেই চড়ে বসলাম। চারদিক কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। কড়া নজরদারি সারা শহরজুড়ে।

কিন্তু স্টেশনের ছবিটা একেবারে আলাদা। অগুনতি মানুষ এসে হাজির হয়েছেন স্টেশনে। নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় জম্মু ছাড়তে চান সকলেই। সেইসঙ্গে সীমান্তে ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে নিরাপত্তা। নিরাপত্তা রক্ষীদের একপ্রান্ত থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অন্যপ্রান্তে। রাত ৮ টা ৪০ মিনিটে ট্রেন। নির্ধারিত সময়ের ৫ ঘন্টা আগে হাজির হয়েছি আমরা।

জার্নি শেষ। ফিরে এলাম কলকাতায়। অফিসের ঠান্ডা ঘরে বসে উপত্যকার উত্তপ্ত পরিস্থিতির আঁচ পাচ্ছিলাম। পুলওয়ামা কান্ডের পর পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিয়েছিল তা টিভির পর্দা এবং সেখানকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেই তুলে ধরেছিলাম পিপল টিভির ওয়েবসাইটে।

পেরিয়ে গেছে বেশ খানিকটা সময়। তাওয়ি নদী দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। মিটে গেছে লোকসভার ভোট পর্ব। ক্ষমতার শীর্ষে সেই ‘লৌহমানব’ জুটি। কাশ্মীর নিয়ে যে ভাবনা চিন্তা তারা শুরু করেছেন সেই ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কথা রেখেছেন তাঁরা।

সদ্য জম্মু-কাশ্মীরের পুনর্গঠন নিয়ে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। জম্মু কাশ্মীরের ওপর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে স্পেশাল স্ট্যাটাস। ৩৭০ এর সঙ্গে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ৩৫(এ)। দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে। জন্ম হয়েছে দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ। 

টানা পাঁচ দিন ধরে ১৪৪ ধারা চলার পর ক্রমশ পরিস্থিতি শান্ত হতে শুরু করেছে। যদিও খবরটা সরকারি সূত্রের। পরিস্থিতি নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কারণ শ্রীনগর বিমানবন্দর থেকে ফিরিয় দেওয়া হয়েছে কংগ্রেস নেতা গুলাম নবী আজাদকে। ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে সিপি(আই)এম এর সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকে। কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাহুল গান্ধি। উপত্যকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নজরও দিতে বলেছেন তিনি।

রাত পোহালেই ইদ। উৎসবের রোশনাই কতটা পড়বে সেখানকার মানুষগুলোর উপর, সে বিষয়ে তদারকি করতে উপত্যকার মানুষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলছেন ‘মিশন ৩৭০’ এর মাস্টারমাইন্ড এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। পরিকল্পনার রূপায়ন থেকে বাস্তবায়ন অবধি প্রতিটি পদক্ষেপেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে গ্রীন সিগন্যাল দিয়ে এসেছেন তিনি। পুলওয়ামা ঘটনার সময় ডিসকভারি চ্যানেলের শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ঘটনার পরেও তাঁকে নিরুত্তাপ দেখেছে গোটা দেশ। প্রবল সমালোচনার ঝড় উঠেছিল গোটা দেশ জুড়ে। নীরবতা ভেঙে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ২ তে পাক জঙ্গিদের যোগ্য জবাব দিয়েছিলেন তিনি।

কেন্দ্রের গদিতে যেই থাকুক না কেন, দেশের মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া তাঁর প্রথম এবং প্রধান কাজ। কাশ্মীরের ইদের রোশনাইয়ের ছবি কতটা ঝলমলে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ উপত্যকা জুড়ে বন্ধ রয়েছে যোগাযোগের ব্যবস্থা।

কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন হাজারও মানুষ। যদিও এই কাশ্মীর ইস্যু কী আন্তর্জাতিক বিষয়? নাকি ভারতের ঘরোয়া সমস্যা, তাও পরিষ্কার হয়নি। কারণ উপত্যকার রাজনৈতিক দলের নেতারা এখনও বন্দি। শ্রীনগর থেকে আগ্রা নিয়ে যাওয়া হয়েছে জেলবন্দি জঙ্গিদের।

সরকারের সিদ্ধান্তে হাসি ফুটেছে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মুখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কাশ্মীরের মাটিতে জমি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। সেদিনও ঘটনার সাক্ষী ছিলাম আমরা। আজও আছি। জম্মু কাশ্মীর নিয়ে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত অনেকটা শেষ পাতে মিঠে পানের মত। এখন প্রশ্ন, এই স্বাদ কতদিন থাকবে সেখানকার মানুষের মুখে? নাকি অচিরেই মিলিয়ে যাবে কর্পূরের মত?