সঞ্চারী পূততুন্ড

”চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,

এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’। 

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই লেখাটির বর্তমান সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। মানবজাতির উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে গোটা বিশ্ব আজ চরম সংকটের মুখোমুখি। মাটি, বাতাস, জল সর্বত্রই দূষণের বিষে ভারাক্রান্ত। 

তার মধ্যে নতুন করে থাবা বসিয়েছে এক অদৃশ্য শত্রু। নোভেল করোনা ভাইরাস, যা গোটা বিশ্বে মহামারীর আকার নিয়েছে। এক লক্ষের বেশি মানুষ মারা গিয়েছে শুধু আমেরিকাতেই। 

এই অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে,প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা করে চলেছেন বিশ্বের তাবড় গবেষকরা। কোনও রক্তপাত ছাড়াই লক্ষ মানুষের মৃত্যু যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। 

কিন্তু কথায় আছে মন্দের ভালো। সব খারাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কিছু ভালোর বীজ। যাকে শুধু খুঁজে বার করতে হয়।নভেম্বরে চিনের উহান প্রদেশ এই সংক্রমণের সূত্রপাত। যা ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করেছে গোটা বিশ্বে।

কিন্তু তখন থেকেই যেন ভালো কিছু হওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। করোনা সংক্রমণের ফলে গোটা বিশ্বকে রক্ষা করা অন্যতম চাহিদা হয়েছে সকলের।

একের পর এক দেশ জারি করতে থাকে লকডাউন। সবাইকে ঘরে থাকার কথাই বলা হয়েছিল। বন্ধ ছিল কলকারখানা থেকে  শুরু করে যানবাহন। এর ফলে এক ধাক্কায় বায়ু দূষণের মাত্রা অনেকটাই কমে গিয়েছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরে।

সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, দূষণের কারণে ওজোন স্তরে যে ছিদ্র তৈরি হয়েছিল,পৃথিবীর মাটিতে চলে আসছিল সেই ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি। সেই ক্ষতে প্রলেপ পড়েছে। এককথায় বলা যায় দূষণের  ক্ষত সারিয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে ওজোন স্তর। 

এখানেই শেষ নয়, পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছে গোটা বিশ্বে। দূষণের মাত্রা কমে যাওয়ায় পরিষ্কার হচ্ছে কলকাতার আকাশ। এত স্বচ্ছ আকাশ বহুদিন দেখেনি কলকাতাবাসী। 

লকডাউনের মধ্যেই বিভিন্ন সুন্দর দৃশ্য দেখা গিয়েছে। স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছিল জীবজন্তুরাও। কোথাও বিরল প্রজাতির কচ্ছপ অলিভ রিডলে সমুদ্রতট এসে লাখো লাখো ডিম পেরেছে, আবার কোথাও আপন খেয়ালে খেলে বেরিয়েছে ডলফিনের দল।

করোনা ভাইরাসের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকায় লকডাউন শুরু হয়। তারপর থেকেই বন্ধ ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক। এই পার্কের সিংহদের দলবদ্ধভাবে রাস্তায় এসে বিশ্রাম নিতে দেখা গিয়েছে। 

চলতি বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ভাবনা জীব-বৈচিত্র। আয়োজক দেশ কলম্বিয়া। গোটা বিশ্বের  জীব বৈচিত্রের ১০ শতাংশ কলম্বিয়াতে বর্তমান। কলম্বিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ লক্ষ জীব বৈচিত্র বিলুপ্তির পথে। এই পরিস্থিতিতে এর থেকে ভাল ভাবনা অন্য কিছু হতে পারে না।

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। গোটা বিশ্ব এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। প্রতিবছর দিনটি পালিত হলেও কোথাও যেন মান্যতায় খামতি থেকে যায়। একদিন পরিবেশ দিবস পালন করে বাকি দিনগুলো আমরা পরিবেশকে ভুলে থাকতেই যেন পছন্দ করতাম। 

কিন্তু এবছরের পরিবেশ দিবস অন্যবারের তুলনায় অনেক আলাদা। করোনা যেন হাতে-কলমে শিক্ষা দিল বিশ্ববাসীকে। এখনও না শিখলে হয়ত ভবিষ্যতে এমন অনেক মহামারির সম্মুখীন হতে হবে মানবজাতিকে!