|| আঁখি রায় ||

এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েকে ভর্তি করতে আক্ষরিক অর্থেই কালঘাম ছুটে যেত অভিভাবকদের। গামছায় মুড়িগুড় বেঁধে নিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আগের দিন রাতেই কলকাতা চলে আসতেন তাঁরা। পরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতেন কলকাতা কিংবা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাতে।

পরের দিন নাওয়াখাওয়া ভুলে হুড়োহুড়ি করে তুলতে হত ফর্ম। তারপর আরও একদিন এভাবেই দুটো দিন মাটি করে ছেলেমেয়েকে ভর্তি করতে হত। ভর্তির চালান হাতে পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলতেন ছাত্রছাত্রী এবং অবশ্যই অভিভাবকরা।

এসব এখন অতীত। বাম জমানায় রাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তেরটির মতো। আর পালাবদলের পর জেলায় জেলায় তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। তাই বাঁকুড়া কিংবা পুরুলিয়ার যে অভিভাবক গামছায় মুড়িগুড় বেঁধে নিয়ে কলকাতা কিংবা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েকে ভর্তি করতে হত্যে দিতেন, তাঁদের আত্মীয়রাই এখন ছেলেমেয়েদের ভর্তি করে দিচ্ছেন ঘরের কাছের বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই রাজ্যের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ুয়ার খরা!

কিছুদিন আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তির শেষ দিন। আসন ভর্তি না হওয়ায় ফের বাড়ানো হয়েছে ভর্তির দিন। তবে তার পরেও যে সব বিভাগের সব আসন ভরবে, এমন কষ্ট কল্পনা করতে পারছেন না শিক্ষকদের একাংশও।

সেই কারণেই ঘরের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার তত্ত্ব আওড়াচ্ছেন শাসকদল ঘনিষ্ঠ শিক্ষা শিবিরের লোকজন!

শিক্ষাবিদদের একাংশ আবার এই তত্ত্ব খারিজ করে দিয়েছেন।তাঁদের পাল্টা দাবি, ঘরের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হওয়ার পরেও তো অক্সফোর্ড কিংবা হাভার্ডে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই রব। ঘরের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় হলেই যদি সমস্যা মিটে যেত, তবে আর লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ছাত্রছাত্রীরা ছুটতেন না বিভুঁইয়ে!

শিক্ষাবিদদের এই অংশের মতে, আসলে রাজ্যে পালাবদলের পরে উচ্চ শিক্ষিতদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করতে সরকার ব্যর্থ। তার জেরেই উচ্চশিক্ষা লাভে অনীহা। বাম জমানায় প্রতিবছর নিয়ম করে এসএসসি পরীক্ষা হত। সেখানে চাকরি নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগও উঠত। তৃণমূল জমানায় এসএসসি পরীক্ষা ক’বার হয়েছে, তা বলতে প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী হতে হয় না।শিল্পায়ন না হওয়ায়ও হতাশ শিক্ষার্থীরা।

কাঁড়িকাঁড়ি টাকা খরচ করে ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে কী করবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না অভিভাবকরাও। সেই কারণেই ভিড় বাড়ছে পেশাদার কোর্সগুলোতে। অভিভাবকরা হিসেব কষে দেখছেন, পেশাদার কোর্স শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই মোটামুটি একটা চাকরি জোটানো যায়। বাইরে গেলেও মেলে মোটা মাইনের চাকরি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স শেষে দিতে হবে রেল-ব্যাঙ্ক-ক্লার্কশিপের পরীক্ষা। এতে যে সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি মিলবে, তা নয়। কবে শিকে ছিঁড়বে, সেই আশায় হয়তো কেটে যাবে আরও পাঁচ বছর। তার পর চাকরি মিললেও ভালো, না মিললে আর তো কোনও সুযোগ নেই! ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সেই কারণেই বেঞ্চ ফাঁকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যে বেঞ্চের একটা আসন পেতে এক সময় হত্যে দিত হত অভিভাবকদের!        

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here