||নয়ন রায় ||

অসুস্থ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সম্প্রতি তাঁর একটি ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। তার পরেই মন খারাপ বঙ্গবাসীর।মন ভালো নেই সিপিএমেরও। একটা রেজিমেন্টেড পার্টিতে ব্যক্তি দলের ঊর্ধ্বে নন, তবে…

বাম জমানার দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের সিংহভাগ সময়টাই মুখ্যমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন জ্যোতি বসু। তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের শেষের দিকে তথ্য সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্ব সামলেছিলেন এই বুদ্ধবাবুই। তার পর জ্যোতি বসুর সঙ্গে মনোমালিণ্যের জেরে মন্ত্রিসভা ছেড়ে বেরিয়েও যান। এই সময়ই দল বুঝতে পারে বুদ্ধবাবুর গুরুত্ব। জ্যোতি বসুর পরে দল এবং বঙ্গবাসীর কাছে তিনিই যে বামফ্রন্টের গ্রহণযোগ্য মুখ, তা বুঝতে দেরি হয়নি আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের কর্তাদের। সেই কারণেই তড়িঘড়ি তাঁকে ফেরানো হয় মন্ত্রিসভায়। জ্যোতি বসু অবসর নেওয়ার পরে তিনি হাল ধরেন বাম সরকারের।

আদ্যন্ত রাজনীতিবিদ বুদ্ধবাবু ভালোবাসেন ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরতে। আর ভালোবাসেন ঘন ঘন সিগারেট খেতে। তাঁর এই ভালোবাসাটাই কাল হয়ে দাঁড়াল। ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগল শরীর।

তবে শরীরের এই যে হাল, সেটা মাত্র কিছুদিন হল হয়েছে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ও বীরবিক্রমে তিনি সামলেছেন বিরোধীদের শানিত আক্রমণ।

সরকারে থাকাকালীন ঔদ্ধত্যের জন্য একাধিকবার তিনি এসেছিলেন খবরের শিরোনামে। কখনও বিরোধীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ওরা ৩৫, আমরা ২৩৫। কখনওবা বলেছিলেন, দে হ্যাভ বিন পেইড ব্যাক বাই দেয়ার ওন কয়েন। এই সব উক্তির জেরে দলের একাংশও তাঁর সমালোচনা করতে ছাড়েননি। যদিও সে সমালোচনা প্রকাশ্যে আসেনি কখনও।

২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও বামেদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনিই। বামেরা ক্ষমতায় ফিরলে তিনিই হতেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে মহাকরণের দখল নেয় তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রীর তখতে বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুদ্ধবাবু চলে যান অন্তরালে।

বাম রাজত্বের পতনের জন্য সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে বুদ্ধবাবুর সরকারের ভুল নীতিকেই দায়ি করেছিলেন বামেদেরও অনেকেই।হাল ধরতে পারেন না, কেউটে ধরতে গিয়েছেন বলে সমালোচনা করেন তাঁরই মন্ত্রিসভার রেজ্জাক মোল্লা। এরই কিছুদিন পরে সিপিএম ছেড়ে রেজ্জাক যোগ দেন তৃণমূলে। সহকর্মীদের এই সমালোচনা এবং বিপদের দিনে দল ছেড়ে চলে যাওয়া ভালো চোখে দেখেননি বরাবর আদর্শ আঁকড়ে বেঁচে থাকা বুদ্ধবাবু।

মুখ্যমন্ত্রীর তখত চলে যাওয়ার পরেই ভেঙে পড়েছিলেন বুদ্ধবাবু।অবসর কাটাতেন বই পড়ে, আর দিনে একবার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে গিয়ে। মাস কয়েক ধরে সেটা করতেও আর শরীর সায় দিচ্ছে না। অগত্যা ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্রিগেড সমাবেশ করেন বামেরা। সেখানে গাড়ি করে নিয়ে আসা হয়েছিল বুদ্ধবাবুকে। বক্তৃতা দিতে পারেননি। অশক্ত শরীরে উঠতে পারেননি মঞ্চেও। গাড়িতে বসেই কিছুটা সময় কাটিয়ে ফের বাড়ির পথ ধরেন। অসুস্থ বুদ্ধবাবুকে দেখেও সেদিন গলা ফাটিয়েছিল জনতা।তখনও তাঁরা ভেবেছিলেন অচিরেই সুস্থ হয়ে ফের বামেদের ভরা ব্রিগেডে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত ছুঁড়ে সম্বোধন করবেন, কমরেড!

সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমের দৌলতে বুদ্ধবাবুর যে ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে বোঝাই যাচ্ছে তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ। তবে বঙ্গবাসীর মতে, রাজ্যের এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে বুদ্ধবাবুর ফিরে আসাটা ভীষণভাবে প্রয়োজন।  কারণ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক যে প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে রাজ্য জুড়ে তার একমাত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারতেন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা মানুষটিই!

এই প্রতিবেদন বামপন্থী মানসিকতায় পরিবেশন করছি না। পরিবেশন করছি একজন সাংবাদিক হিসাবে।

সব শেষে বলি, ভাল থাকবেন বুদ্ধ বাবু। মন খারাপ নিয়েই বলছি বাংলার বামপন্থীরা আজ বিষণ্ণ আপনার ভগ্ন শরীর দেখে।তারা আজ দিশাহীন। কারণ বর্তমানে এ বাংলার বামপন্থীদের রাজনৈতিক অভিভাবকের বড় অভাব…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here