সঞ্চিতা পাল

(আদতে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। বিবাহ সূত্রে থাকেন বাংলাদেশে। দুর্গাপূজায় ঢাকার পরিস্থিতি উঠে এল তাঁর কলমে)

আবহাওয়ার পূর্বাভাস ছিল, সকাল থেকে আকাশ মেঘলা থাকবে, সঙ্গে বৃষ্টিও হতে পারে। তাতে ভ্রু-কুঁচকে ছিল উৎসব প্রিয় বাঙালির। শঙ্কা জেগেছিল, মহাসপ্তমীর উৎসব কি বৃষ্টিতে পণ্ড হবে?

কিন্তু সেই শঙ্কা উড়িয়ে ষষ্ঠী থেকে অষ্টমী পর্যন্ত মাঝে মধ্যে সকালের দিকে কিছুটা বৃষ্টি হলেও তাতে উৎসবের আমেজে ভাঁটা পড়েনি।

প্রতিদিনই প্যান্ডেলগুলোয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের মানুষও যোগ দিয়েছেন শারদোৎসবে।

সকাল থেকে মণ্ডপে মণ্ডপে বাজতে থাকে ঢুলির ঢোল। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দুর্গাপুজো বেশ পুরনো। ঢাকেশ্বরী দেবী মা দুর্গা রূপেই পূজিত হন। তারপরও মন্দির প্রাঙ্গনে মৃন্ময়ী দুর্গা প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে পুজো হয়।

নতুন ঢাকা আর পুরানো ঢাকার ঠিক সংযোগে ঢাকেশ্বরী মন্দির। উৎসবের প্রাক্কালেই ঢাকের বাদ্যে ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দিরের চারপাশটা হয়ে ওঠে উৎসব প্রিয় বাঙ্গালির মহামিলন স্থান।

ঢাকেশ্বরী মন্দির

তিথি মেনে সপ্তমীর সকালে কদলি বৃক্ষের সঙ্গে আরো আট ধরনের উদ্ভিদ সাদা অপরাজিতা লতায় জড়িয়ে লালপেড়ে সাদা শাড়িতে বউ সাজিয়ে কলাবউ স্থাপন হয়। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে শুরু হয় ভক্তদের লাইন ধরে শ্রদ্ধা জানানো। তারপর চলতে থাকে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ সারাদেশে এবার প্রায় ৩১ হাজার ৩৯৮টি প্যান্ডেলে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছে। মণ্ডপের সংখ্যা গত কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে। তবে এবারের দুর্গাপুজোয় জৌলুস চোখে পড়বে যে কারোরই।

ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকা বনানী মাঠে দুর্গাপুজো ১২ বছরে পা দিল। এখানকার বিশাল মাঠে শামিয়ানা টাঙিয়ে বানানো হয়েছে প্যান্ডেল। শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নয়, মুসলিমসহ অন্যান্যরাও লাইন ধরে ভেতরে ঢুকে দেবীর দর্শন করছেন। এই মাঠের একপাশে আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বারোয়ারি মেলা।

এই মেলায় বাংলাদেশের নামকরা ব্যান্ডের শিল্পীরা তাঁদের গান দিয়ে বিমোহিত করছেন নতুন প্রজন্মকে। তাঁদের সরব উপস্থিতি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে শারদোৎসবকে।

মেলায় গ্রামীণ বাংলার আবহমান কালের চেনা সেইসব নিমকি, পাঁপড়, লাড্ডু, চুড়ি, খেলনার দোকানের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলেছে কর্পোরেট কালচারের বার্গার, কফির দোকান। ধর্মীয় বই নিয়ে স্টল সাজিয়েছে ইসকন।

দুর্গাপুজো ঘিরে মেলার আয়োজন

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপুজোয় পুরানো ঢাকার কথা আসবেই। বনেদি এই এলাকার শাঁখারিবাজারের পুজো একটু ভিন্ন। সরু গলির মধ্যেই সারবেঁধে পুজো হয় এই রাস্তায়। কিন্তু ভিন্নতা হল সব ঠাকুরের প্যান্ডেল হয় উঁচু করে বাঁধা মাচার ওপর। নিচ দিয়ে মানুষের যাতায়াতের রাস্তা, তার ওপর প্যান্ডেল।

আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিন্নধর্মীদের জন্য তৈরি ছাত্রাবাস ‘জগন্নাথ হল’ -এ দেখা মেলে বিরল দৃশ্যের। এই ছাত্রাবাসের ভেতরে স্থায়ী নাটমন্দিরে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছেন এখানকার আবাসিক ছাত্ররা। নাটমন্দিরের পাশেই রয়েছে মহামতি গৌতম বুদ্ধ, স্বামী বিবেকানন্দ, মহাপ্রভু চৈতন্য দেবের মূর্তি। এখানে দেবী দর্শন সবার জন্য উন্মুক্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুজো

আবার আগামী বছর ফিরে আসবে এই দিন। তারপরও মনখারাপের মধ্যে দিয়ে দশমীতে নিরঞ্জন করতে হবে দেবী দুর্গাকে।

শুভ চেতনার প্রতিষ্ঠা আর অশুভর বিনাশ- এই মনোবাসনার মধ্য দিয়ে ঢাকার চর্তুদিক ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীতে বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে ৮ অক্টোবর শেষ হবে এবারের দুর্গাপুজো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here