||অনন্যা তেওয়ারী||

চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

জায়গাটা কে একটু নিজের বলে ভাবতে শুরু করেছি আজকাল। দিনে রাতের বাস কিনা। ব্রেকফাস্ট , লাঞ্চ, ডিনার-রোজের অভ্যেস হাতে নিয়ে এই শহরে দিন যাপন। পাঠকরা এতদিনে আশা করি জেনে গেছেন আমার বর্তমান ডেরার গল্প। তবুও মনে করিয়ে দিয়ে বলি আমার আপাত বাসস্থান শহরটার নাম টেম্পে। দেশটা একদম-ই আমার দেশ না। এর নাম আমেরিকা । আর রাজ্য অ্যারিজোনা। রাজ্যের রাজধানীর একদম গা লাগোয়া এই শহর।

আমার দেশ থেকে এদেশে আসার রাস্তাটা বেশ লম্বা। উড়োজাহাজ ছাড়া গতি যে নেই সেটা বলাই বাহুল্য। কলকাতা থেকে আবুধাবি- তারপর আবুধাবি থেকে নিউইয়র্ক হয়ে ফিনিক্স। ফিনিক্স এয়ারপোর্ট আমার ডেস্টিনেশন এয়ারপোর্ট। সেই এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি গাড়িতে ১১ মিনিট। আসার সময় নিউইয়র্ক এয়ারপোর্টে ফিনিক্সের ফ্লাইটের জন্যে অপেক্ষার সময় ছিল প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা। এয়ারলাইন্সও এখান থেকে পাল্টাতে হবে।

আমার নির্ধারিত এয়ারলাইন্স ছিল jet blue. যথাযথ নির্দেশমতো নিজের departure গেটের সামনে বসে আছি। টানা ২৩ ঘন্টা journey এর পর এয়ারপোর্টে বসে বসে ঝিমোচ্ছি তখন। হঠাৎ মৃদু ‘মিঁয়াও’ করে একটা আওয়াজে ঘোরটা একটু কেটে গেল। মনে মনে ভাবলাম কী আজব রিংটোন রে বাবা !! ভাবার সাথে সাথে আবার দুবার এক আওয়াজ ‘মিঁয়াও মিঁয়াও’। এদিক ওদিক তাকালাম আওয়াজের উৎস ঠাওর করতে। কে এই আজব রিংটোন এর মালিক, জানার ইচ্ছেটা বেশ চাগিয়ে উঠেছিল। ফোন তো অনেকেই ঘাঁটছে এরকম ভাবতে ভাবতে আবার সেই এক আওয়াজে তৎক্ষণাৎ চোখ গেল উল্টো দিকের aisle এ বসে থাকা এক শ্বেতাঙ্গীর পায়ের নিচে নামানো ব্যাগটার দিকে।

চৌকো একটা ব্যাগ অনেকটা স্টোরেজ ব্যাগ এর মতন দেখতে। যার মাথার ঢাকা নেট এর কাপড় দিয়ে তৈরি এবং চেন দিয়ে ব্যাগ এর মুখটা আটকানো। সেই নেট এর ফাঁক দিয়ে জুলজুল চোখে তাকিয়ে আছে আস্ত বিড়াল।

WELCOME TO AMERICA-আগেই বলেছি আমি পৃথিবীর সব দেশ দেখিনি তাই অন্য কোন দেশে কী আছে বিশেষ বলতে পারবোনা। তবে এই দেশে এসে এর এই পোষ্য সংক্রান্ত অভিনবত্বটা বেশ চোখে পড়েছে। নিজের দেশে যাওয়া আসার পথে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশনে এরকম পোষ্য সঙ্গ আমি দেখেছি বলে বিশেষ মনে পড়েনা। বা দেখলেও বিমানপথে প্রথমবার দেখলাম।

এখানে পৌঁছে কিছুদিন গেছিল নতুন ঘর গুছিয়ে উঠতে। সেই সময়টুকু পার করে এক সপ্তাহ-দশ দিনের মাথায় বেটার হাফের সাথে বিকেলের দিকে হাঁটা পথে ঘুরতে বের হই। মাসটা February এবং বেশ একটা ঠান্ডা কনকনে হাওয়া। প্রথম দিনে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল। রাস্তার ওপর বিশেষ চোখ যায়নি। শুধু এটুকু বুঝেছিলাম রাস্তায় ভিড় নেই। বরঞ্চ জন মানব নেই বললেই চলে।

বিষয়টা লক্ষ্য করি দ্বিতীয় দিন। আমার বাড়ি একটা বড়ো সিগন্যালের মুখে। হাঁটতে বেরিয়ে সিগন্যাল ক্রস করার জন্যে সিগন্যাল পোস্টে পথচারীদের বোতামটা টাচ করতে যাবো তখন দেখি বোতামটার একটু ওপরের দিকে সিগন্যাল পোস্টটার গায়ে একটা পোস্টার আটকানো। তাতে একটা বিড়ালের ছবি দেওয়া। যার গায়ের রং সাদাকালো মেশানো। পোস্টে বলা হয়েছে ওই ছবির বিড়ালটি হারিয়ে গেছে।

হারিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বিড়ালটির সম্ভাব্য বিবরণ দিয়ে একটি মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে সন্ধান পেলে ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে। মুখটা একটা মাছি ঢোকার মতন হাঁ হয়ে গেছিলো। বেটার হাফের দিকে অবাক চোখে তাকাতে সে বললো ” এত অবাক হবার কিছু নেই। রোডটা ক্রস কর EXPLAIN করছি।”

যা জানতে পারলাম আর রাস্তা ঘাট লক্ষ্য করে যা বুঝলাম তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই রূপ –

>এখানে রাস্তা ঘাতে মালিকত্বহীন রাস্তার কুকুর বা বিড়াল পাওয়া সম্ভব নয়। যদি পাওয়া যায় তারা কোনো কারণে হারিয়ে গিয়ে থাকবে। এবং পশু ওয়েলফেয়ার কমিটি থেকে নিয়ে চলে যায়। কুকুর/বিড়ালটির যদি পরিচয় পাওয়া যায় তাহলে মালিককে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসে ক্লেইম করতে হয়। নতুবা unidentified কুকুর হলে ৪৮ এর মধ্যে সেটা আবার নতুন করে lease এর জন্যে available হয়ে যায়। এর দুটোর কোনোটাই না হলে হারানিধি নিধন হয়।

কুকুর/বিড়াল তুমি গলার leash না বেঁধে বাড়ি থেকে বার করতে পারবেনা।

কুকুর/ বিড়াল আক্রমণাত্মক ও সংক্রমিত হলে তাকে চার দেওয়ালের মধ্যে রাখা নিয়ম।

সংক্রমিত কুকুর/ বিড়াল থেকে থার্ড পার্টি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মালিকের জরিমানা অবধারিত।

কুকুর/ বিড়াল পুষলে তার যাবতীয় খেয়াল মালিককে রাখতে হবে। তার সুসু-পটি থেকে শুরু করে health issues-জায়গায় জায়গায় পেট waste er bin আছে।

আপনার পোষ্যর বর্জ্যও আপনি যত্ন করে তাতে চালান করে দিন। রাস্তা এবং বাড়ি সাফ রাখার অস্ত্র। আর কম বেশি এদেশীয় সব শহরেই অ্যানিম্যাল হসপিটাল ফেসিলিটি তো আছেই

এখানে পেট ইন্সুরেন্স খুব ই common শব্দ। আমি এদেশে এসে এই অভিনবত্ব চাক্ষুষ করেছি।
তোমার পোষ্য র ওপর কোনো রকম অত্যাচার দণ্ডনীয় অপরাধ। হাজতবাস এবং জরিমানাও হতে পারে।

এরকম আরো নানা রকম পোষ্য সংক্রান্ত নানা নিয়ম মেনে চলে এখানকার মানুষেরা। রাজ্য বদলে নিয়মেরও অনেক বদল আছে। আমার বাসার রাজ্য যেহেতু অ্যারিজোনা আমি অ্যারিজোনা পেট ল-এর নিয়মের একটা লিংক দিলাম লেখার শেষে। যদি আরো ডিটেইলসে কেউ জানতে চান।

যাই হোক, বক্তব্য এটাই যে বাকহীন প্রাণীগুলোর জন্যে এতটা দরদ বেশ মন ছুঁয়ে যায়। নিজের দেশে শ্বশুর-বাবার সারমেয় গোষ্ঠীর প্রতি ভালোবাসা দেখে ভীষণ ভালো লেগেছিলো। আমার বেটার হাফ ও বেশ পোষ্যপ্রেমী। এই টেম্পে গ্রামে নতুন করে এসে পোষ্যর গুরুত্ব বোঝাটা একটা নতুন শিক্ষা। আর এই শিক্ষার বিকাশ বা আত্তীকরণ এদেশে মানুষের মনের গভীরে বেঁচে থাকে। সরকার সতর্ক এবং জনগণও।

থাকুক ওরা এভাবেই ভালোবাসায় আদরে যত্নে। এদেশের থেকে আমরা এত কিছু আপন করেনি, এই ধরনের নিয়মগুলো কেন করিনা? এই কেনোর কোনো উত্তর নেই। কেউ কেউ হয়তো বলবে আর্থিক ব্যালান্সের কথা। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে সেটাও একটা টালবাহানা। অনেক সময় অবশ্য কিছু unavoidable circumstances থাকে। কিন্তু সেটা আদপে সংখ্যায় গুটিকয়। বাকিটা আলসেমি।

শুধু একটা নিয়মে একটু খারাপ লাগে। Pet void system- ওটুকু বাদে বাকিটা বেশ হৃদয়স্পর্শী।

….. অ্যারিজোনা পেট ল লিংক….
https://www.animallaw.info/statutes/us/arizona?fbclid=IwAR1AcpSNG6jjxmHjzPQO2Y4GAEYumJw1ZrQY04FyGFxhhblMrTPCrDMYdQI

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here