(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

।। অনন্যা তেওয়ারী ।।

গরম এখনো যায়নি। বর্ষাকালের বৃষ্টি প্রায় নেই বললেই চলে। বসবাস যে মরুভূমির রাজ্যে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এর মধ্যে বাঙালির ১২ মাসের ১৩ পার্বণের বদান্যতা এদেশে নেই। যেটুকু আছে সেটুকু কুড়িয়ে, এদিক ওদিক ঝটিতি সফরে বেরিয়ে পড়ি বেটার হাফ-এর সাথে।

আমেরিকায় আসা ইস্তক বেড়াতে অনেক গেছি। কিন্তু বিশেষ করে এই বেড়ানোর কথা দিয়ে শুরু করবো। কারণ, আমার বসত রাজ্যের নাম অ্যারিজোনা এবং এই রাজ্যের গাড়ির নাম্বার প্লেটের নিচে সুন্দর ভাবে লেখা থাকে ” State of Grand Canyon ” .

 গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এর রাজ্যে থেকে পৃথিবীর সপ্তম প্রাকৃতিক আশ্চর্যের একটা না দেখলে তো এই বসতটাই  বৃথা।

আমার বসবাসের শহর হলো টেম্পে। আমার বাড়ি থেকে গ্রান্ড ক্যানিয়ন ভিজিটর সেন্টারের আনুমানিক দূরত্ব প্রায় ২৪০ মাইল। সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা। কিন্তু গ্রান্ড ক্যানিয়ন দেখতে লাগে পুরো দিন। তাও যদি মোটামুটি দশ শতাংশ শেষ করো। আমাদের কাছে ছুটি বলতে হাতে গোনা তিন দিন । শনি-রবিবারের সিকে প্রতি সপ্তাহেই ছেঁড়ে। কিন্তু এবারে লেবার ডে উপলক্ষে সোমবারেরও এই দলে যোগদান।

শ্রম দিবস যেহেতু তাই তারিখটা মে মাসের প্রথম দিন বলে ভুল করবেন না। দেশটা আমেরিকা এবং এদের শ্রম দিবস উদযাপন হয় সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার। আমাদের বেড়ানোর সোমবার সেরকমই একদিন।

বেড়ানোর সময় দুই রাত্রি তিন দিনের। তিনটে তারিখের মিল মিশ। আমার লেখায় তাই এই অভিজ্ঞতা তিনটে অধ্যায়ে ভাগ করে বলবো। সেইমতো আমাদের এই তিন অধ্যায়ের প্রথম অধ্যায় হলঃ

১. যাত্রা শুরু – ৩১.০৮.২০১৮

সকাল ৪:৩০ টায় এই লম্বা একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসলাম। আধবোজা চোখে আরো ১০ মিনিট ধরে ঢুলে অপূর্ণ ঘুমের বাকিটুকুর রেশ কাটালাম। সকাল ৬:৩০ টায় গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু হবে।

 Long weekend এর শুভ সূচনা। আমরা প্রথম দিনের জন্যে ঝুলিতে রেখেছি Meteor Crater আর Walnut Canyon . রাত্রিতে থাকবো flagstaff এ। দুই রাত্রের বাস এর জন্যে আমরা এই শহরটাকেই বেছে নিয়েছি। ফ্লাগস্টাফ থেকে আমাদের নির্ধারিত সব জায়গা গুলোই কাছে। গ্রান্ড ক্যানিয়ন ১ ঘন্টা ২০ মিনিটের পথ। সর্বোপরি শহরের কম উষ্ণতায় একটু স্বস্তি । দু’দিনের জন্য হলেও লোভ সামলানো কঠিন।

সময়মতো বেরিয়ে পড়েছি প্রথম গন্তব্যের দিকে –

Meteor Crater

ছোট থাকতে একবার উল্কা বৃষ্টি দেখেছিলাম। সেটা শুধু দেখেই ছিলাম। তার ভালো, মন্দ এবং পতন এইসবগুলো বোঝার কোনো চেষ্টাই করিনি। পরে “কুছ কুছ হোতা হ্যায় ” দেখে নিজের সংস্কার এবং কুসংস্কারের আগায় ধোঁয়া দিয়ে জেনেছিলাম  এরকম তারা খসলে যা চাইবে তাই পাবে। সেই সব থেকে অনেক দূরে এই নতুন দেশে এসে শিখলাম উল্কার তথাকথিত “Impact “.

ফ্লাগস্টাফ থেকে প্রায় ৩৭ মাইল দূরে উইন্সলোওয়ের কাছে উল্কাপাতের ফলে তৈরী হওয়া এই বিশালাকৃতি গর্ত। সারা পৃথিবী জুড়ে উল্কা পড়ার কারণে এরকম গর্ত অনেক আছে। কিন্তু অ্যারিজোনার এই meteor  crater  সবার প্রথম প্রতিষ্ঠিত উল্কাপাতজনিত গর্ত। Barringer পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত এই জায়গাটি আগে Canyon Diablo Crater  নামে পরিচিত ছিল এবং এরকম গঠন সানফ্রাসিস্কো পিক উপত্যকার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলস্বরূপ ধার্য করা হত।অগ্ন্যূৎপাত জনিত এলাকার মাটি কালো হয়ে থাকে। কিন্তু এখানকার মাটি কিছুটা লাল ধরণের।

মাইন ইঞ্জিনিয়ার Daniel  Barringer প্রথমে এই জায়গাটি উল্কাপাতের ফলে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী বলে দাবি করেন। যদিও সেই সময় এই ব্যাপারটা  গ্রহণযোগ্য না মনে হলেও পরবর্তী কালে Barringer  এর দাবি সত্যি  প্রমাণিত হয়।

গোটা পৃথিবী জুড়ে উল্কাপাত জনিত এধরণের Crater এর অভাব নেই।  কিন্তু ভুমিক্ষয়ের নিয়মানুযায়ী এদের অনেকেই তার প্রাথমিক রূপ হারিয়ে ফেলেছে। অ্যারিজোনার আবহাওয়া অতিরিক্ত শুষ্ক হওয়ার কারণে এই ধরণের কোনোরকম পরিবর্তন ৫০০০০ বছর পুরনো এই Crater  এ আসেনি।

১৯৬০- ১৯৭০ সালের মধ্যে নাসার ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযান apollo  মিশন এর প্রস্তুতি এর নির্ধারিত প্রশিক্ষণ মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এইখানেই নেন।  এই Meteor  Crater পৃথিবীর সাথে সৌরমণ্ডলের যোগাযোগের একটা অবিচ্ছেদ্দ নিদর্শন।

এখানকার মাটিতে লোহার পরিমান এত বেশি, যে মাটির মধ্যে চুম্বক ঘুরিয়ে এখনো চুম্বকের আসে পাশে আকর্ষিত হয় সেই মাটি। এখানকার পাথর বা মাটি বাইরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি নেই। Barringer  পরিবারের ব্যক্তিগত গিফট শপ থেকে নিদর্শন হিসেবে বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের বাইরে নিয়ে যেতে গেলে সেই খরিদারির বিল থাকা জরুরি।

ব্যক্তিগত মালিকানার জন্যে কিনা জানা নেই তবে যাবতীয় Crater গুলির মধ্যে meteor crater সব থেকে সু-সংরক্ষিত। 

হাত সাফাই এর মহিমা দেখিয়ে লোকজনকে পাথর বা মাটি পকেটস্থ করতে দেখা চোখে পড়েনি। সেটা হয়তো এদেশ নিয়ম মাফিক চলতে পছন্দ করে বলেই। ও হ্যাঁ একটা কথা বলতে ভুলেই গেছি। এন্ট্রি ফি আছে।  $১৮ মাথা পিছু।

 ওয়ালনাট ক্যানিয়ন

প্রথম দিনের দ্বিতীয় গন্তব্যের স্থান হলো ওয়ালনাট ক্যানিয়ন। এখানে যেতে হলে ধরতে হয় বিখ্যাত “রুট ৬৬” ।  উজাড় করা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বুক চিরে বেরিয়ে গেছে মানুষের তৈরী এই রাস্তা। পৌঁছতে দুপুর ১:৩০টা।  পৌঁছেই দুপুরের খাবার খানা গোগ্রাসে গিলে নিজের চোখ দিয়ে আবিষ্কার করলাম ওয়ালনাট ক্যানিয়ন-কে।  জায়গাটা  স্বর্গ থেকে কিছু কম মনে হচ্ছিল না। প্রাচীন সভ্যতার মানুষ ১১২৫-১২০০ শতাব্দীতেও  বাস করত এখানকার গভীর খাতওয়ালা পাহাড়ের গায়ের খুপরি খুপরি বাড়িতে।

বাড়ি বললেও ভুল হবে। তাদের জীবনযাত্রার ছবি প্রতি পরতে পরতে ছড়িয়ে ক্যানিয়নের প্রত্যেক বাঁকে।  এই পুরো ব্যাপারটাকেই ” রিবন অফ লাইফ” বাক্যাংশে সঙ্গায়িত করা হয়েছে। ওপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে যত নিচে নেমে যাবে তত  পৌঁছে যাওয়া যাবে প্রাচীন সভ্যতার কাছাকাছি। যেহেতু জায়গাটা একসময়ের বসবাসস্থল ছিল সেই কারণে এটাকে ন্যাশনাল মনুমেন্ট আখ্যা দেওয়া হয়।

নিচের দিকে নামার পর একসময় দেখলাম আকাশে মেঘ করেছে। দেরি না করে সন্তর্পণে ওপরে উঠে এলাম। হড়কা বনের সতর্কতা থাকে এসব জায়গায়। মানব জীবনের এই রোমাঞ্চকর সংঘর্ষ দেখে মনটা হঠাৎই একটু খারাপ হয়ে গেছিলো। এরা  কত সংঘর্ষ করে জীবন কাটিয়েছে। অথচ আমাদের জীবনে এত স্বাচ্ছন্দ্য তবুও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি।

যাই হোক।  অনেক সকালে ওঠা হয়েছিল এতটা পথ এসে দু জায়গা ঘুরে এখন বেশ ক্লান্ত লাগছে। তাই ফ্লাগস্টাফের  দিকে  গাড়ি ছুটছে। টেম্পের গরম এর পর হাইকিং এর উত্তাপে শরীর ঝাঁঝরা। একটু শীতের  লোভ।  সেই লোভের পথে পা বাড়িয়ে ফ্লাগস্টাফে এসে পৌঁছলাম। AIRBNB  থেকে বুক করা পুরো বাড়ি। বাড়ির সামনেই দেখা যাচ্ছে Sanfrancisco  Peak . নম্বর লক এ দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই অপেক্ষা করে ছিল একরাশ চমক।  এবং এক চমকপ্রদ শিক্ষা।

কী সেই শিক্ষা, সেটা জানার জন্যে আরেক সপ্তাহের অপেক্ষা জুড়ে দিলাম। সঙ্গে থাকবে আগামী দিনগুলোর সত্যি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here