(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

অনন্যা তেওয়ারী

ঘড়িতে ঠিক রাত ১১ টা বেজে ১২ মিনিট। কিছুক্ষণ আগে বাড়িতে ঢুকেছি। পুজোর রেশ কেটেও কাটেনা। প্রবাসেও বিজয়া সম্মিলনীর ঘাটতি নেই। কিন্তু একপ্রকার ভালোই। বিদেশ বিভূঁইয়ে পুজোর ভিড়ে লোকজনের সাথে আলাপের কমতি পুষিয়ে নেওয়া গেলো কিছুটা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওই বর বাবাজি-ই নয়তো বিদেশে বাংলার অক্সিজেন। ভয় হয়,বাংলার জিভ জড়িয়ে সেটা কোনোদিন না বাংরেজি হয়ে যায় !

যাই হোক আপাতত এখনো বাংলা বাংলা এবং ইংরেজি ইংরেজি-ই আছে। লেখাটাও তাল মিলিয়ে তরতরিয়ে এগুচ্ছে।

আমি থাকি আমেরিকার অ্যারিজোনা-তে। এবং অ্যারিজোনা মানেই চূড়ান্ত গরমের ইঙ্গিত। সেই গরমটুকু পেরিয়ে গেলে এখানকার আবহাওয়া ভীষণ আরামদায়ক। ভ্রমণ বিলাসীদের জন্যে আদর্শ। বিশেষ করে এই সময়টা।

কিছুদিন ধরেই যখন থেকে আবহাওয়ার বদল হতে শুরু করেছে তখন থেকে অল্প কিছু বদল লক্ষ্য করেছি এখানকার ট্রাফিকে। এখন ভিড় বেশ বেড়েছে। যেটা ভীষণই এতদিনের আমার চাক্ষুষ অভ্যাসের বাইরে। প্রত্যেক ট্রাফিক সিগন্যালেই থমকে থমকে বাড়ছে রাস্তায় গাড়িদের ভিড়।

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব-১২

কয়েক পর্ব আগে অ্যারিজোনার গরম প্রসঙ্গে লিখেছিলাম এখানে লোকজন গরমকালে বাড়ি ভাড়া দিয়ে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জায়গায় গ্রীষ্মকালটা কাটিয়ে ফেরে। এখন সেই ঘরে ফেরার সময়। কার্যত থমথমে খালিখালি শহরটার একটা জমজমাট মেজাজ। আজকে বিজয়া সম্মিলনীর মধ্যে এর-ওর সাথে আলাপচারিতা চলাকালীন এই কথা উঠতেই একজন বললো-হ্যাঁ এই সময় তো “স্নো বার্ড” রা আসে তাই ভিড় বাড়ে।

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব ১১

এবার স্বল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী হলে যা হয় আর কি। আমার সেই ভয়ঙ্করী বিদ্যার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনে আমার মনে হলো সাইবেরিয়ার ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে পরিযায়ী পাখীরা বোধ হয় এই সময়টা অ্যারিজোনা-তে কাটিয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে আমার এই অভূতপূর্ব মনগড়া জ্ঞানের চৌহদ্দি নিয়ে আমি আর তাদের চৌকাঠ ডিঙাইনি।

ফেরার পথে বেটার হাফ-কে জিজ্ঞাসা করলাম ,” আচ্ছা অ্যারিজোনা তে পরিযায়ী পাখিরা সাইবেরিয়া থেকে কোন এলাকায় আসে? ” . বেটার হাফ একটু অবাক চিত্তে প্রশ্ন করলো , ” তোর কেন মনে হলো এই সময়ে সাইবেরিয়া থেকে পাখিরা অ্যারিজোনা-তে আসে? কে বললো?” আমি নিরলস বদনে আলোচনার বিবরণ দিয়ে বলি,” তখনই তো জানলাম স্নো বার্ড-রা আসে তাই ভিড় বাড়ে?”

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব- ১০

বেটার হাফ আমার জ্ঞানের বহরের দৌড় সহ্য করতে না পেরে, প্রচণ্ড হাসির দমকে গাড়ি একটা জায়গা দেখে দাঁড় করিয়ে কয়েক মিনিটের উদ্দাম হাসির পর বললো,” গ্যাস ট্যাস হয়নি তো?” “স্নো বার্ড শব্দটা অ্যারিজোনা তে একটা গোষ্ঠীর মানুষের জন্যে ব্যবহার করা হয় যারা এই সময়ে অন্য জায়গার প্রচন্ড ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে এখানকার মনোরম পরিবেশে শীতকালটা কাটাতে আসে। এর সাথে পাখির কোনো সম্পর্কই নেই। আচরণগত কারণে পরিযায়ী পাখিদের সাথে তুলনা করার জন্যে স্নো বার্ডের ব্যবহার।”

আমি লজ্জায় টমেটো হয়ে গিয়ে ফ্রিজের ভিতর শীতকাল যাপন করবো ভাবতে ভাবতে বাড়ি এসে পৌঁছালাম। রাস্তায় যথারীতি সাইবেরিয়ান পাখিদের ঠেলায় ভিড় বেশি ছিল ! এতদিনের ১০ মিনিটের রাস্তা পেরোতে লাগলো ২০ মিনিট। মনের দুঃখে নিজের জ্ঞান বাড়াতে ল্যাপটপ খুলে বসলাম। তার থেকে যা বুঝলাম এই স্নো বার্ডের মধ্যে বেশিরভাগটাই রিটায়ার্ড লোকজন। যারা চূড়ান্ত আবহাওয়া থেকে বাঁচতে এই পন্থা নিয়ে থাকেন। মিনেসোটা, শিকাগো এই সব জায়গার গাড়ির সংখ্যাও তাই এই সময় হয়তো বেড়ে গেছে।

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব- ৯

স্নো বার্ডরা চাইলে এই পরিযায়ী বাসস্থানের জায়গা-তে ভোটও দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্লেস অফ অরিজিনের ভোটার লিস্টের তালিকা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে।

অনেকে এই ” স্নো বার্ড” শব্দটা গালিগালাজের পর্যায়ে ফেলে থাকেন। তারা নিজেদের কে “উইন্টার ভিজিটর্স” বলতে বেশি পছন্দ করেন। অ্যারিজোনাতে এই সব কারণে এই সময়ে বাড়ি এবং হোটেলের ভাড়া বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশকিছুটা বেড়ে যায়। আর কপাল দেখুন আমাদের। এই দুর্মূল্যের সময়েই কিনা আমাদের বাসা বাড়ি বদল করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব-৮

আমেরিকায় এসে থেকে এই বাড়িটাতেই নতুন সংসারের শুরু। ছেড়ে যেতে হয়তো একটু খারাপ লাগবে। এই সপ্তাহান্তটাই এই বাড়িতে শেষ সপ্তাহান্ত।

যাইহোক প্রসঙ্গে আসি। পড়াশোনা করে জানতে পারলাম এই স্নো বার্ডদের চাপে রেস্টুরান্টগুলো ভর্তি থাকছে। তাই শীতকালটা রান্নার আঁচে ঠান্ডা কাটাবো ঠিক করেছি । অ্যারিজোনা স্নো বার্ডদের আপন করে ভোটের অধিকার পর্যন্ত দিয়ে দিচ্ছে। আর আমার দেশে আমার বাবার ভোটার কার্ডের ঠিকানা ২০০০ সাল থেকে চেষ্টা করেও পাল্টাতে পারেনি !!

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব-৭

আমেরিকার নিয়মের স্বচ্ছতা সম্পর্কে কিছু বলবোনা। কারণ আমার বলার সে জায়গা এবং অভিজ্ঞতা কোনোটাই তৈরি হয়নি। কিন্তু যে কাজ যুক্তিযুক্ত এবং আইনত সে কাজের জন্যে অন্তত ২০ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এখানে থাকেনা। স্নো বার্ডরা তাই এখানে ভালো থাকে। আর আমার ষাটোর্ধ বাবা প্রশাসনিক যাঁতাকলে এখনো ঠিকানা পাল্টে উঠতে পারেনা। এত কিছু আপন করি, নকল করি এই দেশ থেকে, নিয়ম শৃঙ্খলাগুলো কে এড়িয়ে যাই কেন?

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যাঃ পর্ব ৬
যাইহোক এই সব কেন-দের কোনো উত্তর হয়না। আমেরিকা তুমি এভাবেই অনন্য হয়ে থেকো। আর আপনারা যারা এতদিনে আমাকে চিনে গেছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি। সম্ভব হলে এই সময় ঘুরে যান। খুব কম সময়ের জন্যে অ্যারিজোনার এই লোভনীয় আবহাওয়া পাওয়া যায়।
আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব- ৫

একটু ভিড় বাড়লে ক্ষতি নেই। এদেশ আপন করে নিতে জানে।

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা-পর্ব ৪
আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা-পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here