(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

||অনন্যা তেওয়ারী||

অগাস্ট মাসের শেষ দিনের শিক্ষাটা মগজে নথিভুক্ত করে রাতের হালকা ঠান্ডা চাদরের তলায় দেহটা চালান করে দিলাম। সেপ্টেম্বর ২০১৯-এর শুরুটার জন্যে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিলো। আমার যাত্রা গল্পের মধ্যম অধ্যায়।

যারা নতুন পড়ছেন তারা যদি খেই খুঁজে না পান কষ্ট করে একটু এক্সপ্লোর করে আগের লেখা দুটো পড়বেন।তাহলে সূত্র খুঁজে পেতে সুবিধে হবে। যাই হোক আমার যাত্রা পথে ফেরত আসি।

দ্বিতীয় দিন-

২. সফরনামা গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্ক ০১.০৯.২০১৯

বাড়ি থেকে ট্রিপে বেরোনোর আগে গ্রান্ড ক্যানিয়ন দর্শন আমাদের to do লিস্টের স্টার সাইট ছিল। পৃথিবীর প্রাকৃতিক আশ্চর্যগুলোর একটা, তাই উত্তেজনা কে বাড়াবাড়ি বলে ছোট করবনা। প্রথম যখন তাজমহল দেখেছিলাম মনে হয়েছিল মানুষের তৈরী এরকম আশ্চর্যের সৌন্দর্য কি আর কোথাও আছে? ঘুরে এসে বুঝলাম মানুষের ওপরেও একজন আছেন যিনি মানুষের মতন এই জটিল জীবটি তৈরী করেছেন। আর তৈরী করেছেন গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো অদ্ভুত প্রাকৃতিক অনবদ্য সৌন্দর্য।

আগে থেকে রিসার্চ ওয়ার্কে যা বুঝেছিলাম তাতে গ্রান্ড ক্যানিয়নের সৌন্দর্য নির্যাস একদিনে শেষ হবার নয়। কয়েক ঘন্টাতে তো দূর অস্ত।তাই ঠিক করেছিলাম যেদিন গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখবো সেদিন দেখার খাতায় শুধু সেটাই থাকবে। যেমন ভাবনা তেমনই কাজ। সকাল ৭ টা নাগাদ বেরোলাম।

বেরোনোর সময় গ্রান্ড ক্যানিয়ন সাউথ রিমের উষ্ণতা গুগল করে দেখলাম ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফ্লাগস্টাফ ঠান্ডার জায়গা, তাই চারজনে পাতলা পাতলা জ্যাকেট গায়ে দিয়ে বেরোলাম। ফ্লাগস্টাফ থেকে গ্রান্ড ক্যানিয়নের দূরত্ব প্রায় ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট।

গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ভিসিটর্স সেন্টারের টোল এন্ট্রির কাছে পৌঁছতে প্রায় সকাল ৮:৩০ বাজল। কিন্তু পৌঁছে যা দেখলাম তাতে একেই লং উইকেন্ড এবং তারপর রবিবারের বাজার তাই এন্ট্রি লাইন বেশ সুদীর্ঘ।

আন্দাজ করতে চাইলে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের ডানকুনি হাইওয়ে টোল প্লাজার জ্যামে যারা ভুগেছেন তারা একবার রিওয়াইন্ড করে নেবেন। সেরকমই এখানে এন্ট্রি গেট পেরোতে আরো আধঘন্টা। যদিও পাস আমাদের আগেই কাটা। যারা ভবিষ্যতে ঘুরতে যাবেন তাদের সুবিধার্থে ছোট একটা কথা বলে রাখি।

গোটা আমেরিকা জুড়ে অজস্র ন্যাশনাল পার্ক আছে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা এন্ট্রি ফি। অনেকগুলো ন্যাশনাল পার্ক কভার করতে গেলে ব্যাপারটা একটু খরচ সাপেক্ষ। তাই যারা মোটামুটি বছরে অন্তত ৩ থেকে ৪ টে ন্যাশনাল পার্ক দেখার প্ল্যান রেখেছেন তারা একটা annual পাস কাটতে পারেন। ৮০ ডলার প্রতি বছরের চার্জ। একটা পাসে চারজনের এন্ট্রি। “America The Beautiful” নামের পাসটি ভ্রমণ বিলাসীদের জন্যে এক কথায় পয়সা উসুল।

যাই হোক এসে পৌঁছলাম। ঢোকার পথে এন্ট্রি গেটে দেওয়া হলো সাউথ রিমের পকেট ম্যাপ। গাড়ি পার্ক করে গায়ের হালকা জ্যাকেট খানা খুলে কোমরে বাঁধলাম। টেম্পারেচার পারদে এখন ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চড়চড়িয়ে বাড়ছে রোদ এবং গরম।

শুরু করলাম Mather Point থেকে। এখানে গিয়ে মুখ টা হাঁ হয়ে গেল। চোখের সামনে রূপকথা যদি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি তাহলে যেমন অভিব্যক্তি হওয়া উচিত ঠিক তেমন। NASA head quarter Washington D.C. এর ক্রিয়েটিভ স্ট্রাটেজিস্ট Stefanie Payne তার ” A Year in the National Parks: The Greatest American Road Trip” বইতে গ্রান্ড ক্যানিয়ন সম্পর্কে লিখেছেন ” It is a spectacular illusion- a deeply three-dimensional scene flattened onto an earthly canvas.”

Mather Point থেকে বসে গ্র্যান্ড বিউটি উপভোগ করার ব্যবস্থা করা আছে। এরই মধ্যে বন্ধুর স্ত্রী একটা হোঁচট খেয়ে আঘাত লাগিয়ে ফেললো। রোগা পাতলা মানুষ সে। আমার মতন মেদশ্রী না। তবুও মেদিনী আমাতে ইন্টারেস্ট পেলেননা। কাটা জায়গায় ব্যান্ডেড লাগিয়ে Mather point থেকে হাঁটা শুরু করলাম। ১.১ মাইলের লম্বা ট্রেইল। সেই পথ ধরে হাইকিং করতে শুরু করলাম। যত এগোতে থাকলাম প্রতিটা খাঁজে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের অদ্ভুত আলাদা আলাদা রকমের সৌন্দর্য।

প্রায় ৫০ মিনিট লাগলো yavapai pont এ পৌঁছাতে। কারণ মাঝের প্রত্যেক ভিউ পয়েন্টে চলেছে ম্যান্ডেটরি ফটো সেশন। যতটা সৌন্দর্যটাকে গ্যাজেটস্থ করা যায় আর কি। এই ১ মাইল হাইকিং শেষ করে চার জনেরই পেটে খিদে উঁকি মারছে। ব্যাগে খাবার আছে। খেয়ে দেয়ে উঠে আবার শুরু করব।

এর পরের অংশ হলো ” Trail of Time” , প্রায় ২ কিলোমিটার হাইকিং এর প্রতি মিটার ১০ লক্ষ বছরের সময় নিরিখে ভাগ করা। এই trail থেকে ক্যানিয়ন এর গভীরতা, গঠনমূলক পাথরগুলোর পরিচয় পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ রাস্তার ধারে ধারে পাথরের ভগ্নাংশ রাখা।

সেগুলো দেখে পারিবারিক বন্ধু বলে উঠলো, ” আমাদের দেশ হলে এতক্ষণে সিঁদুর মালা আর ধুপ পড়ে যেত পাথর গুলোতে”। ২ কিলোমিটার রাস্তায় ২০০০ লক্ষ বছরকে ডিঙিয়ে শেষ হলো আমাদের পদব্রজ। ঘড়িতে তখন দুপুর ৩ টে।

এরপর শুরু হলো আমাদের স্মৃতিসূচক খরিদারি। সেসবে কিছুটা ধসিয়ে পা বাড়ালাম ফিরতি পথে। ফিরতি পথে ভিসিটর্স সেন্টার অব্দি যেতে বাস ধরতে হবে। সে বাস ন্যাশনাল পার্কের মধ্যেই চলে। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত চার আত্মা ভিসিটর্স সেন্টার পৌঁছে একটু ক্লান্তি কাটাতে আশ্রয় নিলাম আইস ক্রিম দেবতার।

পায়ের কাছে এসে জুটলেন কাঠবেড়ালি মহারাজ। বেটার হাফ তাকে খানিক আইস ক্রিম ও খাওয়ালেন এবং তিনি নির্দ্বিধায় চেটে চেটে খেয়েও নিলেন। এই কাঠবেড়ালি প্রসঙ্গে বলি। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কের সাউথ রিম-এ এদেরকে ” Most Dangerous Animal ” বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই সাবধান। আমাদের ভারতবর্ষের প্রাচ্য শিক্ষায় শিক্ষিত কাঠবেড়ালিদের মতো এরা মোটেও লাজুক এবং নিরীহ না।

এদের গায়ে রাম রাজ্যের কোনো চিহ্ন নেই। বরং এরা আদপে কলির পশু। আপনার শরীরে রেবিস এর বিষও ঢোকাতে পারে।
হাইকিং এর সময় একটা নীল রঙের নাম না জানা পাখি দেখেছিলাম। খুব সুন্দর।আর ক্যানিয়নের বুকে ভেসে বেড়াতে দেখেছি California Condor . অনেকটা আমাদের শকুন প্রজাতি।

ক্যানিয়নের বুক চিরে বার বার উঁকি মেরেছে কলোরাডো নদী। দূর থেকে জলের রং লাল। হয়তো বা সেটা ক্যানিয়নের খাঁজের প্রতিচ্ছবি।

গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের নাম যে কেনো এরকম সেটা না গেলে বুঝতে পারতাম না। এর বিশাল ব্যাপ্তি একদিনে দেখে শেষ করা অসম্ভব। লেখার সাবজেক্টরা শেষ হবার না। ৭ ঘন্টার অভিজ্ঞতা সাতটা অধ্যায়েও কুলোনোর না। চোখের তৃপ্তি মানসিক তৃপ্তি বারবার দেখেও মেটার না। তাও অর্ধেকও দেখা হয়নি।

আর এত যে ছবি তুললাম তার কোনোটাতেই সৌন্দর্য সঙ্গায়িত হবার না। তাই Stefanie Payne এর বই থেকে আরেকটা লাইন না উল্লেখ করে পারলাম না-

” There will never be a photograph of Grad Canyon that can adequately describe its depth, breadth and true beauty.”

গ্রীষ্মের সময় বিকেলের দিকে থান্ডার স্টর্ম এর এলার্ট থাকে। তাই বিকেলের পর না যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। হাইকে যাবার সময় অবশ্যই সঙ্গে জল, খাবার এবং মেডিকেল ফার্স্ট এইড রাখবেন। নির্দেশিত সতর্ক বার্তা নজর করে মানার চেষ্টা করাই ভালো।

উদ্দীপনা উত্তেজনায় একদম ধারে দাঁড়িয়ে সেল্ফি না নিলে বিপদ থেকে দূরে থাকা সহজ হবে। একারণেই কিছুদিন আগে এক ভারতীয় দম্পতি প্রাণ হারিয়েছেন।

খুব ক্লান্ত। শেষ যখন টেম্পারেচার চেক করেছি তখন সূর্য মাথার ওপরে আর পারদের কাঁটা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সবাই ধুঁকছি। ৮০ SPF এর সানস্ক্রিন ও ট্যান আটকাতে পারেনি।

রোদে পুড়ে লাল মুখো বাঁদর হয়ে আবার গাড়ীতে উঠে বসলাম। গাড়ি ছুটছে ফ্লাগস্টাফের দিকে। চোখের তেষ্টার রেশটা কাটছেনা।

রাতটা ফুরোলেই ০২/০৯/২০১৯। যাত্রা শেষের ঘন্টা। আবার কবে আসব জানিনা। তবে ফিরে আসার ইচ্ছেটা যে তৈরী হয়ে গেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here