(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

আমাদের WHATSAPP গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন: Whatsapp

।। অনন্যা তেওয়ারী।।

প্রবাসে উদর তুষ্টির স্বার্থে আজ দুপুরের পাতে ভাতের পাশে ইলিশ ভাপা সর্ষের ঝোলে সাঁতরে বেড়াচ্ছিল। বেটার হাফ তার পটু হাতে সপাটে তার ভাগের খানা সাবাড়  করে ফেলে নিজের বাঙালি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। কিন্তু আমার অবস্থা হলো আমি চার ভাগের এক ভাগ শেষ করার পর দম নিচ্ছি। জিভে নিলে বড়ই স্বাদ। কিন্তু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শতাধিক কাঁটার চাপে আমার হাত কিছুটা পর্যুদস্ত আর চোখের পাওয়ারও বাড়লো বলে। আমি হলাম বাঙালি জাতের কলঙ্ক। মুখে বড়াই এবং  প্রমাণে অষ্টরম্ভা। খাওয়া দিয়ে শুরু করলাম কারণ আজকের বিষয়টাই হলো খাওয়া। আমার এযাবৎকাল কালের বিদেশ বাসের রসনা বিলাসের অভিজ্ঞতা।

একটা ছোট্ট পাঁচালী আওড়ে নিই তার আগে। আমার আপাত বসত দেশের নাম আমেরিকা, রাজ্য অ্যারিজোনা এবং বসবাসের শহর টেম্পে। থুড়ি গ্রাম। রাজ্যের রাজধানী ফিনিক্সের পাশেই।

এখানে আসা অবধি আমাদের রোজের খাবারে বাঙালিয়ানা বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছি। রান্নাতে আমার কোনো কালেই বিশেষ আগ্রহ ছিলনা। কিন্তু বাড়ির থেকে দূরে নিজের কাজের বাইরে দিনগুলো পার করার জন্যে এই রান্নার প্রতি ভালোবাসাটা আপনা থেকেই  তৈরি হয়। তবে শুধু নিজের জন্যে বোধ হয় কেউ-ই  রান্না করতে ভালোবাসেনা। আমিও ব্যতিক্রম নই। তাই আজকাল রান্নাটা ভালোই লাগে। বেটার হাফকে দেখে বোধ হয় কিছুটা লজ্জায় শিখে নিয়েছি। প্রথম প্রথম ডিমের ঝোল বানাতেও ইউটিউব  লাগতো। এখন ডিমভাতের বাজারে আমিও বেশ হাত পাকিয়ে ফেলেছি।

কন্টিনেন্ট বদল তবুও কন্টিনেন্টাল ছেড়ে যখন দেশের ভোজেই মজেছি তখন রসদের ঠিকানা দেওয়াটাও জরুরি। সবজি বাজার এবং জ্যান্ত মাছের জন্যে আমরা যাই এখানকার এশিয়ান মার্কেট মেকং প্লাজাতে। জায়গাটা ফিনিক্সের আরেকটা উপশহর মেসা-তে। স্বভাব দোষে অনেকসময় আমি এটাকে চাইনিজ মার্কেটও বলি। একবার মুখ ফস্কে বলে ফেলায় কিছু আত্মীয়র কাছে হাসির খোরাক হয়েছি। আমেরিকাতেও চিনা জিনিস?  কিন্তু শব্দ দোষের ভুলটুকু শুধরে নিয়ে যদি দেখি তাহলে সত্যিটা হলো এখনো পর্যন্ত আমার জিভ খানা বেঁচে আছে এই মার্কেটটার জন্যেই। নিজের কন্টিনেন্টাল সেন্টিমেন্টের মেজর সাপোর্ট সিস্টেম।

এর আশে-পাশে প্রচুর এশিয়ান মানে ওই আমাদের চাইনিজ রেস্তোরাঁতে ভর্তি। যদিও এখান থেকে কখনও খাইনি। তবে এখনও পর্যন্ত মার্কিন-চাইনিজ এর স্বাদ ঘটিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভালো না। অন্তত যারা ইন্ডিচিনি খেয়েছেন তাদের জন্যে তো প্রযোজ্য।

চাল, ডাল, মুড়ি, চিঁড়ে ,পনীর, পটল, ঢেঁড়স , শর্ষের তেল চানাচুর ইত্যাদি ইত্যাদি এবং যাবতীয় মশলার  জন্যে লোটাস ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট ছাড়া গতি নেই। জিলিপি পর্যন্ত পাওয়া যায়! তাই মেকং যদি কন্টিনেন্টাল সাপোর্ট হয় তাহলে লোটাস দেশীয় সাপোর্ট। পাওয়ার লিস্ট এত লম্বা যে শেষ করা মুশকিল। লেটেস্ট পারচেজ হলো ঝান্ডু বাম ( খাবার নয় যদিও)। ইন্ডি সেন্টিমেন্ট- পীড়া হারি বাম। সত্যি! দেশ থেকে দূরে থাকার পীড়া থুড়ি ব্যথার উপশম।

বাসন্তী পোলাও সাথে মটন কষা। এ স্বাদের ভাগ হবে না। এর জন্যে আমরা ছুটি কাটাতে বেড়িয়ে পড়ি লোটাসের কাছেই এক মিডল ইস্ট এর স্টোরে । পাঁঠার মাংস কিনা জানিনা কিন্তু গোট মিট ডেসক্রিপশনে ছাগলের মাংস পাওয়া যায়। তাছাড়া এখানে গেলে যেটা জানা যায় সেটা হলো মানুষ নিজের জিভের স্বাদকে কতরকম ভাবে আবিষ্কার  করেছে।  মাংসদের  রকম ফের সত্যিই অবাক করার মতো।  যাই হোক, মটন কষার মাস্টার শেফ হলো বেটার হাফ। তাই এই খানে অন্তত মাসে দুবার যাওয়াটা হয়েই থাকে। তা ছাড়াও যা পাওয়া যায় অর্থাৎ আমাদের দরকারি সেগুলো-ভালো খেজুর,কাজু বাদাম,কিসমিস,ভালো মানের পুদিনা ইত্যাদি। মাঝে মধ্যে আমার মিষ্টি লোভ তুষ্টির  ঠিকানাও এই জায়গাটা। পেস্ট্রি নামে বিক্রি হয় মিডল ইস্টের (মধ্য এশিয়ার) মিষ্টিরা। তবে ওই যে বললাম মূল আকর্ষণ ওই মাটন। বাঙালি সেন্টিমেন্ট।

কিন্তু সদ্য পাওয়া খবর অনুযায়ী এনারা অস্ট্রেলিয়ান পাঁঠা। খবরদাতা আমাদের ইলিশ মাছের যোগানদাতা। কারণ ওনার দোকানে দেশী পাঁঠা পাওয়া যায়। হ্যাঁ লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট দেশী প্লাজা। বাংলাদেশী দোকান। কাসুন্দি, গোবিন্দভোগ চাল এসবের একমাত্র উৎস। টিপিক্যাল বাঙালি সেন্টিমেন্ট। ফিশ ফ্রাই আর পায়েস আয়েশের আঁতুড় ঘর। আজ তো নলেন গুড়ের মিষ্টিও এসেছে বাড়িতে।

বাকি দুধ ডিম পাউরুটি নুন চিনি এসবের জন্যে ফ্রাই ফুডস্‌ অ্যান্ড ড্রাগস অ্যারিজোনার লোকাল চেইন। দেশ বিদেশের কমন ইনগ্রেডিয়েন্টরা এখান থেকেই আসে।

এসব তো গেল নিজের ঘরোয়া রসনার যোগানদাতাদের গল্প। কিন্তু দেশটা যখন অন্য, তখন তাদের স্বাদকে  আপন না করে নিলে এখানকার তেনারা রাগ করতে পারেন। তাছাড়া স্বাদের কোনো দেশ কি হয়? মার্কিন খাবার বলতে যেটা এখানে একচেটিয়া সেটা হলো বার্গার। ব্র্যান্ডেড বার্গার। ম্যাকডোনাল্ডস্‌, বার্গার কিং সব একচেটিয়া বার্গার  চেইন। মার্কিন ফুড ট্রেন্ড অনেকটা মেক্সিকান ধাঁচে নির্মিত।  লস এঞ্জেলস বেড়াতে গিয়ে মেক্সিকান ফুড ট্রাক থেকে মেক্সিকান পদ খাবার অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। এদের ব্যবহৃত মশলা এবং রান্নার পদ্ধতির সাথে নিজের দেশের অনেক মিল খুঁজে পাই। “চিপোটলে” নামে এক মেক্সিকান রেস্টুরেন্টের চেন আছে যেখান থেকে আমাদের রাতের খাবারটা মাঝে মধ্যেই আসে। অন্তত মাসে একবার। টাকো, বারিটোরা নিজেদের অজান্তেই কখন জায়গা করে নিয়েছে মনে। বদল হিসাবে  পিৎজা রাও আনাগোনা করে। তবে এখানে পিৎজা ব্র্যান্ড একচেটিয়া বলতে পাপা জোন্স, রোসিতা। মাঝেসাঝে ডোমিনোজের গাড়িও চোখে পড়ে। আমরা যেমন এদেশের খাবারকে আপন করে নিয়েছি, সেরকম এদেশের মানুষরাও নিজেদের ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছে ভারতীয় স্বাদে। ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ গুলোতে গেলে দেশী মুখের ভিড়ে চোখে পড়বে বিদেশী চেহারার আনাগোনা। সংখ্যাও নেহাত কম না। বেটার হাফের অফিসের একজন এদেশীয় সহকর্মী রোজের দেশী পদের সঙ্গী।

আমার মাসির ছোট মেয়ে কৌতূহল বসে একদিন জিজ্ঞাসা করেই ফেললো। “তোমরা ওখানে কি খাও? ”  হেসে নিজের দেশের খাবারের কথা বললেও মনে মনে নিজেকে এটাই বলেছিলাম যে খাবার জন্যে বাঁচা আর বাঁচার জন্যে খাওয়া। দুবেলা খেতে যে পাচ্ছি এই অনেক। পৃথিবীর কত লোক তো এক বেলা খেয়ে বা না খেয়ে বেঁচে আছে। তাই খাবারের আদপে কোনো দেশ নেই, কোনো ধর্ম নেই, কোনো লিঙ্গ নেই। শুধু বর্ণ আর গন্ধ আর থাকে এক পেট খিদে। তাই দেশে জোম্যাটো ঘিরে যখন বিতর্করা উঁকি মারে তখন নিজেকে বড্ড ছোট মনে হয়। ওই দেশটা তো আমারও।  শ্রেণীগত ধর্ম কিভাবে যে মানব ধর্ম কে ছোট করে সেটা চাক্ষুষ করা মানে একটা কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হওয়া। সেভাবে দেখতে গেলে যে দেশ আছি সে দেশ অনেক ভালো। দেশীয় খাবারে অভ্যস্ত আমি হয়তো কমফোর্ট জোন খুঁজি। কিন্তু ধন্যবাদ আমেরিকা আমার ভাত কাপড় ছাদের সংস্থান হবার জন্যে। আর একটা বৃহত্তর পৃথিবীর সন্ধান দেবার জন্যে।

ভালো থেকো।