(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

আমাদের WHATSAPP গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন: Whatsapp

।। অনন্যা তেওয়ারী ।।

আমার ফ্ল্যাট এর ঠিক ওপরের ফ্ল্যাটে এক মার্কিন ভদ্রলোক থাকেন। মার্কিন কিনা জানিনা, তবে সাদা চামড়ার। সারা শরীরে হাফ প্যান্ট ছাড়া পোশাক বিশেষ চোখে পড়েনা। অন্তত আমার সাথে যতবার মোলাকাত হয়েছে সেই সময়গুলোতে  তো একেবারেই না। ওনার একটি পোষ্য আছে এবং সেটি একটি বিড়াল। এযাবৎ আমার আমেরিকায় বসতকালীন আমেরিকাবাসী সম্পর্কে ধারণা এখনো পর্যন্ত বেশ ভালো। ব্যবহার ও বেশ ভালো পেয়েছি। শুধু মাত্র  আমার ওপরের প্রতিবেশী সম্পর্কে আমি বিশেষ কিছু বলতে পারবোনা।

ঘরে বাইরে যাওয়া আসার পথে বাকিদের সাথে সৌজন্যমূলক কথা বিনিময় হলেও ওই বিশেষ প্রতিবেশী হাসির বদলে ভুলেও হাসেননা। কথা বলা তো দূর অস্ত। ওনার সৌজন্যে বাড়তি পাওনার কিন্তু অভাব নেই। একটাই পাওনা কিন্তু এতটা প্রবল যে মাঝে মাঝে হার্ট-টা হাতে ধরে বসে থাকি। এবার আসি পাওনার কথায়। পাওনা-বলতে অনবরত ধুপধাপ আওয়াজ। মাঝে মাঝে সে আওয়াজ এতই জোরে হয় যে হাত থেকে গ্লাস টা, ফোন টা চমকে পড়ে  যায়। বেটার হাফ কে বললে বলে, এক্সারসাইজ করছে বা বিড়ালের পিছনে দৌড়চ্ছে। সেটাই যদি মানি তাহলে একটা মানুষ ২৪ ঘন্টার মধ্যে ঘুমোনোর সময়টুকু ছাড়া কি সবসময় এক্সারসাইজ করে আর বিড়ালের পিছনে দৌড়ায়?

আমি তো মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে শুনতে পাই ভারী জিনিস ঘরের এদিক থেকে ওদিকে টানছে। লোকটা ঘুমোয় কখন? একদিন নিজের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি কোনো কারণে। হঠাৎ করেই ওপরের দিকে চোখ যায় দেখি ভদ্রলোক অল্টারনেটিভ পায়ে কিৎ কিৎ খেলার মতন করে জোরে জোরে লাফাচ্ছেন। মনে মনে ভাবি। ” ও হরি!!! এর কি তবে লাফানোর রোগ?” কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। আমার দিকে চোখ পড়তেই ভদ্রলোক ধাঁ  ঘরে ঢুকে দরজাটা  সপাটে  বন্ধ করে দিলেন।

বদ্ধমূল ধারণা হলো ভদ্রলোক শুধু মাত্র উত্ত্যক্ত করার উদ্দেশ্যেই এরকম করেন।  অগত্যা condominium অফিসে অভিযোগ করবো ঠিক করলাম। অফিস থেকে ফিরতেই বেটার হাফ কে জানালাম নিজের সিদ্ধান্তের কথা। উত্তরে সাপোর্ট তো এলোইনা উল্টে বলল “কোন দরকার নেই। এখানে সবার কাছেই বন্দুক থাকে, দেখবে গুলি ঠেসে চলে গেছে। মাথা ঠান্ডা করো। এটাই চাইছে হয়তো।  ”

এহেন উত্তরে উৎসাহের বেলুন ফুস করে উড়ে গেল। কিছুটা হতাশ চিত্তে ভাবছিলাম এরকম  হয় নাকি। একটা ভীতু ছেলে । একটা অভিযোগ করতে এত ভাবনার কি আছে। এই সংশয়ের উত্তর নিয়ে শরীরী রক্তপ্রবাহ শীতল করা খবর পেলাম এর মধ্যেই। টেক্সাসে বন্দুকবাজের গণহত্যার খবর।

৩ অগাস্ট ২০১৯ টেক্সাসের এল পাসো শহরের পূর্ব দিকের সিএলো ভিস্তা মলের কাছে ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টারের ঘটনা। ২১ বছর বয়সী একটি ছেলে। নাম প্যাট্রিক ক্রুসিয়াস। ওয়ালমার্টের ভিতরে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে ২২ জনকে।  আহত ২৬ জন। এহেন হত্যালীলার পর নিজেকে পুলিশ এর হাতে সঁপে  দেয় সে। তদন্তে সামনে আসে, ঘটনা ঘটানোর ঠিক ২৭ মিনিট আগে 8 Chan নামক একটি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে নিজেকে গানম্যান  পরিচয় দিয়ে প্যাট্রিক “Hispanic  Invasion ” এর সতর্কতা দেয়। প্রকারান্তরে immigrant মুক্ত দেশ। হয়তো কিছুটা White Nationalism দ্বারা অনুপ্রাণিত। পুরো ঘটনায় ব্যবহৃত বন্দুকটি হলো WASR -10 অর্থাৎ আমজনতার AK-47 . আর এল পাসো নাম যে শহরের, সেই শহরের Hispanic নিরিখ তো না বললেও চলবে।

এতো গেলো ৩ অগাস্টের ঘটনা। পরদিন রবিবারের সকাল ৪ অগাস্ট সকালের চা আর কফি দিয়ে দিন শুরু সাথে খবরের চ্যানেল। কফি খাবো কি চোখ কপালে তুলে দেখি আবার বন্দুকবাজের হত্যালীলা।  এবারের জায়গা ওহিও-এর ডেইটন শহর। Ned Peppers Bar হলো ঘটনাস্থল। হামলাকারী অভিযুক্তর নাম Connor Betts . বয়স ২৪। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে ৯ জনকে।  যার মধ্যে একজন তার নিজেরই বোন। ৩০  সেকেন্ড  সময়য়ের মধ্যে আহত ও মৃত মিলিয়ে সংখ্যা প্রায় ২৭। তদন্তে নাকি এও জানা যাচ্ছে  যে মানুষ মারাটা  নাকি তার ভালো লাগা। অভিযুক্ত শুট আউটে  মৃত।  হামলা চালানোর সময় যে বন্দুক ব্যবহার করা হয় সেটি হলো .২২৩ Caliber  রাইফেল। এবং সর্বোপরি হামলার কারণ এখনো পরিষ্কার না।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নড়ে গেছিলো চোখের সামনের পিকচার পারফেক্ট মানচিত্র। বেটার হাফের কথাগুলো কানের সামনে রিপিট টেলিকাস্ট হচ্ছিলো। আমি আমেরিকাতে এসেছি ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ। শুধু এই বছরেই বন্দুকবাজেদের হামলার সংখ্যা যদি দেখা হয়, তা বর্ণনা করলে এক পর্বে লেখা শেষ হবার কথা না। তবুও যদি জানতে ইচ্ছে হয় তাহলে

https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_mass_shootings_in_the_United_States_in_2019

এই লিংকটা রইলো।

এত বন্দুক হামলা যখন নিত্যদিনের সঙ্গী তখন বন্দুক রাখার নিয়মাবলীর শিথিলতা নিয়ে ভাবনা আসে বইকি। ইউনাইটেড স্টেট অফ আমেরিকার অনেক নিয়মই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যের আলাদা।

GUN LAW ও এরকমই একটা বিষয়। আগেই বলেছি আমার আপাত বসত দেশটা আমেরিকা এবং রাজ্য অ্যারিজোনা।  অ্যারিজোনাবাসী আর  আমি কতটা শিথিল নিয়মের আওতায় আছি সেটা দেখার জন্যে আবার গুগল দার আশ্রয় নিতে হলো এবং  ফলাফলস্বরূপ যা সামনে এলো সেটা এক প্রকার কেঁচো খুঁড়তে কেউটে। রেস্ট্রিকশন শব্দটাই বোধ হয় এখানে রেস্ট্রিক্টেড। শিথিলতা শুধু শিথিল ই নয়, কোথায় যে কড়া  নিয়মে বাঁধা সেটাই বুঝতে পারলামনা। বয়সে শুধু ২১ এর গন্ডি।আরেকটা লিংক দিচ্ছি নিজেরাই একবার পড়ে  দেখুন।

https://en.wikipedia.org/wiki/Gun_laws_in_Arizona

একটু হাস্যকর হলেও না বলে পারছিনা যে পড়তে পড়তে আমার সঞ্জয় লীলা বানসালি জির “রামলীলা” সিনেমার একটা ডায়ালগ মনে পড়ছিল,- “গোলিয়োঁ কি রাসলীলা” . রাস কিনা জানিনা ত্রাসলীলা যে একটা তৈরী করে সেটা বলাই বাহুল্য। কিছুদিন আগেই এখানকার ঘোস্ট টাউন সম্পর্কে লিখেছিলাম। পর পর ৩ এবং ৪ অগাস্টের ঘটনায় একটা জিনিস মনে পড়ে  গেল যেটা সেদিন বলা হয়নি। পরিত্যক্ত সেই শহরে পরিত্যক্ত বাড়িগুলি  এখন রেস্তোরাঁ, আইসক্রিম পার্লার , স্টেক হাউস, চার্চ এসব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং সেসবের ভিড়ে একটা বাড়ি হলো বন্দুকের দোকান। তাহলেই ভেবে দেখুন !!

কিনতে  নিয়ম নেই।  রাখতে নিয়ম নেই। ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নাও। ল্যাঠা শেষ। নিয়মটা আছে কিসে? রাজ্যভিত্তিক নিয়ম যতই আলাদা হোক তাতে কত আলাদা হবে? ক্রমাগত এই ঘটনাগুলো কি আলগা পরিস্থিতির ছবি দর্শায় না?

ছা পোষা মধ্যবিত্ত বাঙালি  বাড়ির মেয়ে আমি এই বন্দুকের বিলাসিতায় সত্যি একটু অবাক। একটু সন্ত্রস্ত। বেটার হাফ এর ভয় যে কতটা সত্যি সেটা বুঝতে এখন আর একটুও অসুবিধে হচ্ছেনা। পরিস্থিতি এমন, বাড়ি থেকে ফোন এলে লাস্ট কয়েকদিন সবাই শুধু সাবধানে থাকতে বলে বার বার সতর্ক করেছে।

ডেইটন শহরের ঘটনা চোখে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয় যে মতিভ্রম যখন চরমে ওঠে তখন ভাই বোন বন্ধু আত্মীয় সবাই নেশার অন্ধকারে মূল্যহীন হয়ে যায়।

এল পাসো তো চিৎকার করে একটাই কথা জানান দেয়। ধর্ম বর্ণের প্রতি আসক্তি কি চূড়ান্ত পরিণতি আর ধ্বংসের দিকে মানুষকে ঠেলে নিয়ে যায়। এ সমস্যা শুধু আমেরিকার নয়।  এই সমস্যা গ্লোবাল।

 না হলে পথ চলতি বাসে  অপরিচিত মহিলা কখনো ডেকে বলেনা যে ,” People Like you, we call them yellow.” এটাই সত্যি। বিশ্বাস করুন কারণ এ অভিজ্ঞতা আমার নিজের।