(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

।। অনন্যা তেওয়ারী ।। 

কি লিখছিলাম ! কি লিখছিলাম! মাথা পুরো ঘেঁটে ঘ। আরে মনেই নেই বিদেশ বিভুঁইয়ের গপ্পো শোনাতে শোনাতে  কোথায় গিয়ে শেষ করেছিলাম। কিন্তু সে দোষ কি আর আমারই।  জন্মসূত্রে বাঙালি। দুর্গা পুজোর এই একটা বেশ ইয়ে কাজ করে তো নাকি। বর্ধমানের মেয়ে আমি। পুরুলিয়ায় আদি বাড়ি।

বাড়িতে নিজেদের দুর্গাপুজো। আর পুজো মানেই তো বাঙালির চূড়ান্ত একটা নস্টালজিয়া।  দুর্গাপুজো নিয়ে রচনা লিখতে দিলে ছোট থেকে বাঙালি সেরা উৎসব বলে লিখে এসেছি বরাবর। ওই সেন্টিমেন্ট এর বীজ জীবনে এমন গভীরে ছাপ ফেলেছে যে পুজোর ছুটির কনসেপ্ট-টা এড়াতে পারলুম না! বোঝো কান্ড! এমন ছুটির মেজাজে ঢুকেছি. যে বেরোতে বেরোতে আরেক হপ্তা কাটিয়ে আজকে এসে আবার পুরোনো নেশার শুভ মহরত করলাম।

এই দাঁড়ান দাঁড়ান। এর মধ্যে আমাকে আবার ভুলে যাননি তো? বঙ্গ emotion এর দোহাই দিয়ে এইবারের মতন ক্ষমা। ক্ষতিপূরণ স্বরূপ আমার পাঁচালিটা  আরেকবার লিখে দিচ্ছি।

আমার জীবনের সাথে যাযাবর শব্দটার একটা নীরব সম্পর্কের কারণে আমার বর্তমান বসবাসের দেশ সুদূর আমেরিকা। রাজ্য অ্যারিজোনা। আর শহর টেম্পে। এই টেম্পে শহর হলো অ্যারিজোনার রাজধানী ফিনিক্সের উপশহর।

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব ১১

বাঙালি সেন্টিমেন্টের দোহাই দিয়ে নিজের রাস্তা পরিষ্কার করলাম ঠিকই। কিন্তু বিশ্বাস করুন একটুকরো বঙ্গদেশের সাথে আলাপ হলো ওই সময়েই। এই সুদূর আমেরিকায় এসে, সত্যি-ই হয়েছে। এবং উপলক্ষ্য একটাই… দুগ্গা দুগ্গা।

এদেশ বাঙালিয়ানা প্রসঙ্গে দুর্গাপুজোর মাহাত্ব বুঝলেও বা যদি বোঝে, ছুটির হেতু টা  বোঝানো খুব কঠিন। ফলস্বরূপ ছুটি কাভি নাহি কাভি নাহি।  অগত্যা দুর্গাপুজোর জন্যে ছুটি নেই যখন তখন ছুটির দিনেই দুর্গাপুজো হোক। আর এই  তত্ত্বের ওপর ভর  করেই বোধ হয় বাঙালিয়ানার ঢাকের বাদ্যি সুদূরে বিদেশ বিভূঁইয়ে এখনো বাজে এবং নিষ্ঠার সাথেই বাজে।

দুর্গাপুজো এমনিতেই অকাল বোধন। তাই অকাল বোধন আরেকটু অকালে হলেই বা ক্ষতি কি। সেরকমই শরৎকালের অকাল বোধনের অকাল বোধন করতে আমরাও এইবার লেগে পড়লাম। প্রবাসে দুর্গাপুজো। যা এতদিন টিভি পর্দায় লাইভ দেখেছি তার চাক্ষুষ দর্শন। কপাল দেখুন, এই বারের পুজোটা কিন্তু আদপেই শনি-রবিবার ঘিরেই হলো। কিছুটা হলেও তাল মেলানো গেছে। আর না মিললেই বা কি। আমার বসত রাজ্যে দুটো পুজোর খবর আমি পেয়েছিলাম- যার একটা হয়েছিলো সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের শনি-রবি বারে।

আরেকটা দুর্গাপুজো, যেটায় আমরা যোগ দিয়েছিলাম সেটা ছিল পুজোর সপ্তাহেই। অক্টোবরের ৪ ৫ ৬ এই তিনদিন বসেছিল পুজোর আসর। এই পুজোর আয়োজক এখানকার Bengali Association- এই Association এর নাম হলো  Samhita. পুরো ব্যাপারটাই আয়োজন করা হয়েছিল Knox Gifted Academy নামে একটি স্কুলে। পুজো পরিচালনার জন্যে একটি কোর কমিটি আছে। পুজোয় অংশগ্রহণের জন্যে ছিল প্রোগ্রাম রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম। তাতে আপনি চাইলে একদিন অথবা দুদিন অথবা তিনদিনের জন্যেই রেজিষ্ট্রেশন করতে পারেন সামান্য কিছু ডলারের বিনিময়ে।

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদের জন্যে ছিল স্টুডেন্ট কনসেশন। পূজার জায়গায় ঢোকার সময় অনলাইন করা রেজিস্ট্রেশনে বুকিং নাম ধরে দেওয়া হলো হ্যান্ড স্টিকার এবং লাঞ্চ এন্ড ডিনার কুপনস। তিন দিনের দিনে-রাতের জন্যে রং দিয়ে নির্দেশিকরণ করা। যারা স্টুডেন্ট কনসেশনে রেজিস্ট্রেশন করেছে সেটার প্রমাণ পত্র হিসেবে ঢোকার সময়ে দেখাতে হয়েছে স্টুডেন্ট আই.ডি কার্ড। ওই সময়টা অবশ্য একবার মনে মনে দুঃখ পেয়ে ভেবেছিলুম, “ইসস পড়াশোনা-টা যদি মন দিয়ে করতাম!!!”

যাই হোক সে ইতিহাস গোপন রেখে এগোনো যাক। শুক্রবার বিকেল থেকে পুজো শুরু হয়ে শেষ হয়েছে রবিবার বিকেলে। শুধু শেষে সিঁদুর খেলা দিয়ে পুজোর শেষ হয়েছে বুঝতে পেরেছি। মাঝের তিথি সন্ধি সব গুলিয়ে গিয়েছে দেশ বিদেশের অমানুষিক একটা সময়ের ফারাকের দোষে এবং বিদেশে নিয়ম নাস্তির তত্ত্বের আড়ালে। শনিবার দিন অঞ্জলি এই ভেবে সকাল সকাল সেজে গুজে পৌঁছে গিয়ে অঞ্জলি দিলাম। মনে মনে ভাবলাম যাক অকালে হলে ও অষ্টমীর পুজোর অঞ্জলি তো দিলাম। পরক্ষণেই শুনতে পেলাম, ” এখন সপ্তমীর পুজোর অঞ্জলি শেষ হলো। বাইরে লাঞ্চ শুরু হয়েছে। লাঞ্চ শেষ হলে অষ্টমীর অঞ্জলি শুরু হবে” ।

আরও পড়ুনঃ আমেরিকা আমি অনন্যা পর্ব- ১০

আগেই বলেছি পুরুলিয়ার আদি  বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়। তাই লাঞ্চের পরের অঞ্জলির বাস্তবিকতা মেনে নিয়ে মা দুর্গা-কে মনে মনে বললাম, ” মা গো, অ্যাডজাস্ট করে নাও।  এত কাল তো বিধি মতোই দিলাম।”

মা দুর্গাকে সাহস করে অ্যাডজাস্ট করার কথা বললেও গর্ভধারিণী-কে সে কথা বলে ওঠার সাহস হয়নি। বাড়িতে পুজো অথচ আমার রক্ত মাংসের মায়ের ছেলে মেয়েরা তার কাছে নেই। কক্ষনো হয়নি। উমা কে আগলে আমার বাপ অকাল বোধনের সুরে আমার আর দিদির জন্যে পথ চেয়ে আছে। ভাবলেই মন খারাপ লাগে। তাই ভাবিনা। মানে ভাবি কিন্তু ভাবছি যে আমি ভাবছি ভাবিনা।

দুধের স্বাদ ঘোলে হলেও কিছুটা তো মিটছে। ধন্যবাদ আমেরিকা আমাকে প্রবাসে পুজোর জায়গা দেবার জন্যে। পুজো-তে গিয়ে একঝাঁক বাঙালির ভিড়ে একবারের জন্যেও মনে হয়নি দেশের বাইরে কোথাও আছি। আর চাঁদের হাট। সেটা বললেও কম বলা হবে। বঙ্গ ললনারা তাদের ঐতিহ্যের অস্তিত্বকে তাদের রূপের ডালিতে এহারে সম্মোহিত করে রেখেছিল- যে আমি নারী হয়েও সেই বঙ্গ ললনাদের ঈর্ষা না, বরং এক মধু মাখা ভালোবাসার চোখে হারিয়েছি-

“এক টুকরো বঙ্গদেশ রঙ্গ রসে ভরা”

সেই রঙ্গ রস কে আস্বাদন করে মা দুর্গা কে বিদায় জানানোর সময় যখন এলো তখন জানা গেল তিনি আর এই আবহাওয়া বদলের সময়ে আর জলে সাঁতরে শ্বশুরবাড়ি ফিরতে চাননা। তাই একবছরের জন্যে প্রবাসের পুজোর খাতিরে তিনি গৃহবন্দি হয়ে কারোর বাড়ির গ্যারাজে বা স্টোররুমে বছর যাপন করবেন। সেই মতন UHAUL কোম্পানি এর ট্রাক ও হাজির-

” আসছে বছর!! আবার হবে…..”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here