(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

||অনন্যা তেওয়ারী||

কথাতেই আছে “The only thing that stands between who you are and who you want to be is… YOU.” বাড়ির ভিতর পা রেখে ঠিক এই কথাটাই মনে হয়েছিল। যদিও phrase টা ধার করা, কিন্তু অভিব্যক্তিটা যে কী চরম বাস্তব সেটা এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না। জীবনে অনেক শিক্ষণীয় বস্তু অধরা রয়ে যেত।

এরকম ভাবে শুরু করলাম বলে কি হোঁচট খেলেন? আরে!!! নবম পর্বের শেষে আগের সপ্তাহে বললাম না যে , ” এক চমকপ্রদ শিক্ষা” র কথা ! তার গল্প দিয়েই আজ শুরু করবো।

ফ্লাগস্টাফে থাকার জন্যে AIRBNB থেকে বাড়ি বুক করেছিলাম। আমরা যেহেতু long weekend এর জন্যে বুক করছিলাম তাই rush-টা বেশি এবং সেই দরুন রাত্রিযাপনের ভাড়াও বেশ বেশি। অনেক খুঁজে খুঁজে দু রাতের জন্যে একটা বাড়ি পাওয়া গেল অপেক্ষাকৃত কমে। সারাদিনের ধকলের পর সেই বাড়িতেই নির্ধারিত দিনে এসে উঠছি। দরজার লক খুলে ভিতরে ঢুকেই জুতো খোলার জায়গা।

জুতো খুলে জিনিসপত্র সব কিছু ড্রয়িং রুমে এসে নামিয়েই আমাদের group এর চার আত্মা ধুপ ধাপ সোফার ওপর বসে পড়লাম। ক্লান্তির আধবোজা চোখ মিনিট দুয়েক পর আস্তে আস্তে খুলে ভাবলাম বাড়িটায় একবার চোখ বোলাই। ঘরে ঢুকে কিছুই সেভাবে খেয়াল করিনি। কিন্তু গা ঝাড়া দিয়ে উঠে সবার আগে যেটা চোখে পড়লো , চট করে সেটার উইকিপিডিয়া সার্চিংয়ে যা রেজাল্ট পেলাম তাতে চোখ প্রায় কপাল ছাড়িয়ে মহাশূন্যের পথে পা বাড়াবে এমন অবস্থা !!

সামনেই দেয়ালে ঝুলছে একটা বড়ো সড়ো ছবি বাঁধানো ফ্রেম। ফ্রেমবন্দি একজন অ্যাথলিটের ছবি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার রানিং ট্র্যাকে দৌড়াচ্ছেন। নিচে নাম লেখা- Janet Cherobon Bawcom.

স্পোর্টস সম্পর্কে আমার জ্ঞান গম্যি বরাবর একটু কম। উইকিপিডিয়া রেজাল্টে থতমত খাওয়া আমি এবং আমার বাকি তিন সঙ্গী মানে আমার বেটার হাফ এবং সস্ত্রীক আমাদের পারিবারিক বন্ধু বাড়িটাকে এক্সপ্লোর করতে উৎসাহী হয়ে পড়লাম।

আরো নজর ঘোরাতে চার দেওয়ালের যেদিকেই তাকাই, দেখি পদকের ছড়াছড়ি। বাড়িটাতে শোবার ঘর সাকুল্যে তিনটি। সেই দিকে পা বাড়াতে আরো চোখে পড়লো পদকের সম্ভার। সমস্ত রকম আন্তর্জাতিকমানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের নিদর্শন। চোখ গিয়ে আটকালো বেডরুমের দিকে, প্যাসেজের দেওয়ালে। ফ্রেম বন্দি হোয়াইট হাউস থেকে আসা চিঠি। নিচে দস্তখত বারাক ওমাবা এবং মিশেল ওবামার। রিও অলিম্পিকয়ে অংশগ্রহণ করার জন্যে শুভেচ্ছা বার্তা।

বাড়ি যখন বুক করেছিলাম তখন বাড়ির মালিকের নাম Jay & Janet উল্লেখ ছিল। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানতামনা এরা কারা। কোথাও একবারের জন্যেও নিজেদের অস্তিত্বের গুরুত্ত্ব জানান দিয়ে কোনো বিজ্ঞাপন চোখে পড়েনি AIRBNB এর অফিসিয়াল সাইটে।

সাফল্যের চূড়ায় বসে কিভাবে মাটির সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয় সেটা শেখারই মতন।

বিশেষ আমি এক ডাকসাইটে সুন্দরী, বিশেষ আমির বর বিশাল মোটা মাইনের চাকরি করে, বিশেষ আমি সর্বগুণসম্পন্না,বিশেষ আমি এবং আমার তিনি বিরাট স্কলার, বিশেষ আমি এবছরের জন্মদিনে Rhodium এর চিরুনি কিনেছি জাতীয় আত্মঅহংকারের এত জ্বলন্ত উদাহরণে জীবন জর্জরিত যে- Rhodium এর দুর্মূল্যতা সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকা বিশেষ আমি আদপে জীবনে মানসিক ভাবে খোঁড়া। যেহেতু খোঁড়া কে খোঁড়া বলতে নেই, সেহেতু লাঠি হিসেবে Jay এবং Janet এর মতন মানুষরা পৃথিবীতে আছেন। আর সেই বিশেষ আমি lamborghini ব্র্যান্ড এর বেলুনে মনুষ্যত্বের হাওয়া ভরে ওড়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু বেলুন যত ব্র্যান্ডেডই হোক না কেনো কিছুদূর যাবে হয়তো, তবে একটা সময়ের পর মুখ থুবড়ে পড়বে। ততক্ষনে মনুষ্যত্বের হাওয়াও বেলুন ছেড়ে হওয়া।

আমরা দুটো বেডরুম ব্যবহার করেছিলাম। সেগুলোতেও পদকরা শোভাবর্ধন করেছে। উল্লেখ্য আমাদের বেড রুমেক দেওয়ালে বিভিন্ন দেশের Currency রা ফ্রেমবন্দি ছিল। তাতে INR অর্থাৎ indian currency- ও ছিল। পরে জানতে পারি Janet এর বেটার হাফ Jay কে কর্ম সূত্রে মাঝে মধ্যেই আমাদের দেশে যেতে হয়। এটা সে দেশ ফেরৎ স্মারকচিহ্ন। ১০০, ৫০ এবং ২০ টাকার নোট ছিল। তাই আসার আগে আমার মানিব্যাগ থেকে নতুন সিরিজের একখনা ১০ টাকার নোট রেখে এসেছিলাম সাথে ভালোলাগার একখানা ছোট চিঠি। পরে যোগাযোগ করে ওনারা ধন্যবাদ জানান।

এদেশে এসে বেশ ভালোই ঘুরছি। তবে এই ট্রিপটা ঘোরার আনন্দের সাথে মানুষ্য সমাজের রকম ভেদ বেশ শিখিয়ে দিলো। ভালো কিছু দেখলে জানলে- নিজের অজান্তেই কখন মনের অলিন্দে নিজের দেশের সাথে তুলনারা উঁকি মারে।

আমি যদি অমুক একজন কেউকেটা হতাম তাহলে আমার মালিকানার বাড়ির AIRBNB এর rate হয়তো বাকি ৫ টা বাড়ির থেকে বেশি হতো। বুকিং সাইটে হয়তো উল্লেখ করতাম অমুক আমি বড়ই লম্বা লেজের অমানুষ।

ধরুন আমাদের দেশের যে সব দ্রষ্টব্য স্থান। আমি ভারতবাসী আমার এন্ট্রি ফি ১৫ টাকা, আমার সঙ্গী বা সঙ্গিনী যদি ওগো বিদেশিনী হয় তাহলে তার বরাতে ৫০০ এর শিকে। বলি ওরা কি বোকা না গাধা? যে বৈষম্য খানা বুঝবেনা? এই এত টো টো করে এদেশে এসে যে ঘুরছি কই ভিনদেশি বলে আমরা তো ডলারে বেশি দিইনা এদেশের লোকের থেকে।

যাই হোক,Jay & Janet সেটাই হতে পেরেছেন বা করতে পেরেছেন যেটা তারা হতে চেয়েছেন বা করতে চেয়েছেন। সমাজের জন্যে শিক্ষা। আমার বা আপনারটাও তাই আমাদের নিজেদের ওপরই।

এই বলে আমি আমার ৩১/০৮/২০১৯ রাতের আলো নিভিয়ে দিনটা শেষ করে ঘুম দেবার পথে।

দ্বিতীয় দিনের অর্থাৎ ০১/০৯/২০১৯ গল্পরা অপেক্ষা করুক পরের পর্বের জন্যে। আর আপনাদের জন্যে আজকের লেখার শেষে একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ লিংক রইলো। চাইবো Janet আর Jay সম্পর্কে জানুন। একবার পড়ে দেখবেন। তাহলেই বুঝতে পারবেন আজকের অভিজ্ঞতা আমার জীবনে শিক্ষণীয় বলার কারণের বুৎপত্তি।

https://en.wikipedia.org/wiki/Janet_Cherobon-Bawcom

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here