||অনন্যা তেওয়ারী||

আমাদের WHATSAPP গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন: Whatsapp

(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

জন্ম আমার গ্রীষ্ম প্রধান দেশে। বাংলা মাস অনুযায়ী জ্যৈষ্ঠ। ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি বৈশাখ আর জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস মিলে গ্রীষ্মকাল। জন্মেওছিলাম ভর দুপুরে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ঘোরতর গরমে পৃথিবীতে ল্যান্ড করেও গরমে তিতিবিরক্ত হওয়াটার কোনো সুরাহা হয়নি। নিজের দেশ তো বাদ-ই দিন। এদেশে তো বাড়ি থেকেই বেরোতে পারছিনা।

এখানে গরমের পারদ ফারেনহাইটে চড়ে। ব্যাপারটা প্রথম শিখি এখানে এসে কেক বানাতে গিয়ে। দেশের OTG এর উষ্ণতার মাপ মাথায় রেখে এখানে কেক ওভেনে ঢুকিয়েছি বেক হতে।  উষ্ণতা সেট করলাম ১৮০-তে।  এবং সময় দিলাম যেমনটা এতদিন দিয়ে এসেছি ঠিক তেমন ৩০ মিনিট। ঘড়ির কাঁটা সময়ের শেষে যখন জানান দিল, ট্রে বার করে দেখি আমার কেক এখনো কেক তৈরির আশেপাশে পর্যন্ত পৌঁছায়নি। গুগল করলাম তবুও ঠিক ব্যাপারটা ঠাওর করতে পারলাম না। এতে অবশ্য দোষ গুগল বাবা কে দেওয়া যায়না। দোষ আমার মোটা মাথার।

বেশ কিছুটা হতাশ চিত্তে বসে বসে কি করব ভাবছি-এমন সময় মিনেসোটা থেকে এক পুরোনো বান্ধবীর ফোন আসে। একথা সে কথার পর উষ্ণতা সেট করার গল্প আসে। সমস্যা বলে জিজ্ঞেস করলাম কি করবো। বললো “ওহ হো! তুই ৩৫০-এ temperature সেট কর। আর ৪০ মিনিট মতন রাখ”। উষ্ণতার পরিমাপটা বুঝলাম। কিন্তু এহেনো বদলের কারণ বুঝিনি এবং সত্যি কথা বলতে বোঝার চেষ্টাও করিনি। তখন একাগ্র চিত্তে কেকটা-কেই কেক বানানোর চেষ্টায় লেগে গেছিলাম।

সেদিনই দুপুরবেলা সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা। এখানে তখন গরম বেশ পড়েছে। এর মধ্যে বেটার হাফ ঘোষণা করলেন যে “আজ গাড়ি নিয়ে যাবোনা। পার্কিং নেই এদের (বিশেষত এই থিয়েটারটায়)। আজ বাসে যাবো।”

আগেই বলেছি টেম্পে শহরে ফ্রি বাস সার্ভিস চলে। বাড়ি থেকে পা বাড়ালাম বাসস্টপের দিকে। গায়ে রোদ রীতিমতন ছেঁকা মারছে। অনেকটা নিজের দেশের ঠিক ভাদ্র মাসের গরমের মতন। বাসে চেপেও গরম কাটছেনা। বেটার হাফ আমাকে দেখে একগাল হেসে বলে “বাইরে আজ  ১০০ ডিগ্রি”। আমি খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে দেখতে তিনি বলেন “আরে!ফারেনহাইট-ফারেনহাইট। এত ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার কিছু নেই”। হায়  রে মোটা মাথা! এতক্ষণে বোধগম্য হলো। সকালের কেকটাও ফারেনহাইটে বেক হয়েছে। এখন রোদ ও ফারেনহাইটে ছেঁকা মারছে।

রাজ্য অ্যারিজোনা। “স্টেট অফ গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন”। ক্যানিয়ন তো গ্রান্ড বটেই সাথে গরমটাও। স্টেট ক্যাপিটাল হলো ফিনিক্স। যার পূর্ব দিকের গা লাগোয়া আমার বাসস্থান শহর টেম্পে। ফিনিক্স-কে প্রকারান্তরে “ডেজার্ট সিটি” বলা হয়ে থাকে। সুতরাং বলাই বাহুল্য কেমন ঝাঁঝরা হচ্ছি। ফিনিক্স ডেজার্ট সিটি হলে এটা Extended ডেজার্ট সিটি। রোদ আর ছায়ার আকাশ পাতাল ফারাক। চারিদিকে ক্যাকটাসের কাঁটা গরমের তীব্রতাকে বেশ ডিফাইন করে। এখন জুলাই মাস। তাপমাত্রা সেলসিয়াস স্কেলে  ৪৫ ডিগ্রি। অতএব (৪৫ c *৯/৫)+৩২= ১১৩ ডিগ্রি F . তাহলেই এবার অবস্থাখানা বুঝুন।

স্থানীয় লোকজন অনেকেই বলে তাপমাত্রা ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। রাস্তায় বেরোলে ভালোই বুঝতে পারবেন যে মার্চ মাসের পর থেকে এখানে লোকজন বাড়িঘর দোর ভাড়া দিয়ে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জায়গায় গ্রীষ্মটা কাটিয়ে ঢোকে। কেউ জল চাইলে ফেরানো তা punishable offense এর মধ্যেই পড়ে।বৃষ্টি লাস্ট চারমাসে একবারও চোখে দেখেছি বলে মনে পড়েনা। দুদিন আগে শান্তিজল ছেটানোর মতন কয়েক সেকেন্ড পেয়েছিলাম অবশ্য । সূর্যের রোদ পড়তে পড়তে রাত আটটা। সুদীর্ঘ এই দিনগুলো এই গরমের বাজারে আরো দুর্বিষহ। বন্ধু বান্ধবরা ফোন করলে বলে কীরে তোদের weather কেমন। গরমের কথা বললে ভীষণ অবাক হয়ে বলে আমেরিকা তো শুনেছি ঠান্ডার দেশ।

কিন্তু এই ধারণার গোড়াতেই গলদ। এটা দেশ কোথায়! এটা তো মহাদেশ। তাই এই চূড়ান্ত Diversity টা আকাঙ্ক্ষিত না হলেও এড়ানো সম্ভব না। এই গরমে আগুন লাগার সতর্ক বার্তা জারি থাকে। মাঝে মাঝেই ৯১১ এর দমকল/মেডিক্যাল এমার্জেন্সি/পুলিশ বাহিনী টুংটুং করে ঘন্টা বাজিয়ে শহরের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। কারণ যাই হোক না কেন।

আগে তো বিকেলের দিকে হাঁটা যেত। এখন বিকেল বলতে সন্ধ্যে সাতটা। কিন্তু সেই সময় বেরোলেও গরমে হাত পা জ্বালা করে।  গরম হাওয়া তে সর্বাঙ্গ শুকনো করে ঝাঁঝরা করতে থাকে। নিজেকে ঠিক ভাবে Hydrated না রাখলে নাক থেকে রক্ত পড়া খুব কমন। কখন যে শরীর শুকিয়ে লাট হয়ে যাবে বুঝতে পারবেন না। ডিনারের পর যে নিজের হাউসিং রেডিয়াস এর মধ্যেও যে ঘুরবো তাও পারিনা। কংক্রিট এর রাস্তা আর ঘাসের জমি দুটোই শুধু তখন গরমের রোদন কাঁদে।

শ্রী চরণেষু মা,

           দেশে তোমরা গরমে কষ্ট পাচ্ছো জানি। কিন্তু চিন্তা করোনা। আমি ভুলেও ভুলবোনা বৃষ্টি না হবার যন্ত্রণা। এই রাজ্যর গরমে আমি দুই দেশের জীবনের কিছুটা করে বাঁচছি। দেশে বৃষ্টির অসম বণ্টন। আর মহাদেশে সেটা আরো প্রবল। এখানে সারাদিন বাতানুকূল পরিবেশে গৃহবন্দি থাকা ছাড়া উপায় থাকেনা। তুমিও তাই চেষ্টা করো।  আর বেশি করে জল খেয়ো। বাবাকেও বোলো। বাগানে পারলে আরো কিছু গাছ লাগিও পরের বছরের কথা ভেবে। খবরে যা পড়ি ভয় হয়। গোটা পৃথিবী মহাপ্রলয়ের বদলে না একদিন জলকষ্টে তলিয়ে যায়।

                                                                       ইতি

অনন্যা