(চেনা-অচেনা বিরাট এক দেশ। এই দেশের অঙ্গুলি হেলনে চলছে বিশ্ব। এই বিপুল শক্তির বিরোধিতা হয় সুদূর রাশিয়ায়-উত্তর কোরিয়া-চিন-ইরান ও বিভিন্ন দেশে। সবমিলে আমেরিকা আর আমেরিকানদের ভাবনা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কেমন সেই দেশের চালচলন। পড়ুন প্রবাসী বঙ্গভাষীর কলমে)

||অনন্যা তেওয়ারী||
আমাদের WHATSAPP গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন: Whatsapp

কিছুদিন আগের কথা। তখন ও গরমটা এরকম পড়েনি। বেটার হাফ মধ্যাহ্ন ভোজের পর  আড়মোড়া ভেঙে বললো,”শনিবার ছুটির দিন চলো বিকেলে একটু ঘুরে আসা যাক কাছ থেকে কোথাও। ” ভাত ঘুমের ঝিমুনি ঝেড়ে ফেলে নড়ে চড়ে বসলাম। চার পেয়ে না হলেও চরে বেড়াতে আমি বেশ ভালোবাসি। তাই ঘুরে আসা প্রসঙ্গে টনক নড়ে গিয়েছিলো। কিন্তু যাবো কোথায় ? পরবর্তী প্রশ্নটা তাই দ্রুত গতিতে ছুটলো- ” কোথায় যাবে বলো?” আজকাল ওয়ান স্টপ solution তো চলমান দূরভাষ। শুধু একটু ছোঁয়ার অপেক্ষা। তাই উত্তরও রেডি।

-“ক্যানিয়ন লেক”।

আবারও মনে করিয়ে দেবার জন্যে বলি, আমার আপাত: বসত দেশটার নাম আমেরিকা আর রাজ্য অ্যারিজোনা। থাকি অ্যারিজোনার রাজধানী ফিনিক্সের কাছে। আর যে জায়গাতে যাচ্ছি তার বিবরণ আমার থেকে শোনার আগে – https://en.wikipedia.org/wiki/Canyon_Lake_(Arizona)   এই লিংকে দেখে নিলে তথ্য অনেক নির্ভুল পাবেন।

প্রসঙ্গে আসি। বেরিয়ে পড়েছি। রাস্তা প্রায় এক ঘন্টার। যেতে যেতে  শহর ছাড়িয়ে শহরতলিতে গাড়ি ঢুকেছে। জায়গার নাম অ্যাপাচে জংশন। ছোট শহর। পাহাড়গুলো তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। হাইওয়ে ধরে যখন গাড়ি দৌড়চ্ছিলো তখন মনে হচ্ছিলো এই বুঝি রাস্তাটা পাহাড়ের বুক চিরে হারিয়ে যাবে। সাথে আমরাও। চওড়া রাস্তা গন্তব্যের যত কাছে এগোচ্ছে ততো  সরু হচ্ছে। আর বাড়ছে রাস্তার বাঁক।

অ্যাপাচে জংশন ক্রস করার পর এলো অ্যাপাচে ট্রেইল। পেরোনোর সময় ট্রেইলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব জানা ছিলো না। পরে জেনেছি, একসময় ইন্ডিয়ানা গোষ্ঠীর সুপারস্টিশন মাউন্টেনে বসতকালীন নিত্যদিনের যোগাযোগের সাথী ছিল এই অ্যাপাচে ট্রেইল। আর যে পাহাড়ের বুক চিরে আমরা গতি নিয়েছি সেটাই হচ্ছে সুপারস্টিশন মাউন্টেন। যেতে যেতে রাস্তায় কোথাও কোথাও ঘোড়ার সতর্ক বার্তা। আবার কোথাও ব়্যাটেল স্নেক (ঝুমঝুমি সাপ) এর জন্য বিপদ বার্তা দেওয়া হয়েছে ।

গন্তব্যের একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আর মিনিট ১৫ এর রাস্তা। আগেই বলেছি রাস্তারা এখন অনেক সরু আর বাঁক এখন বেশ ধারালো। গাড়ির চালক অর্থাৎ বেটার হাফের সমস্ত মনোযোগ সতর্কতার চূড়ান্তে। চারপাশে জনবসতি কমে এসেছে। অ্যারিজোনার বুকে ক্যাকটাসরা সদর্পে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করে রাস্তার বাঁ হাতে চোখে পড়ে কাঠের তৈরী কতগুলি পুরোদিনের স্ট্রাকচার। একটা ব্যানার যাতে লেখা ” Gold Field Ghost Town ” ! আরেকটু নজর করতে চোখে পড়লো অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এই Ghost Town শব্দতে উত্তেজিত হয়ে বেটার হাফ-কে বলতেই সে বলে ,” এখন গাড়ি চালাতে দে। ফেরার পথে দেখা যাবে।”

যাইহোক গন্তব্য আর ৯ মিনিট। আর গাড়ির স্পিড ১৫ তে। পাঠকরা স্পিডের হালহকিকত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলে আশাকরি ভালোই বুঝছেন যে মানুষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের তাড়নায় কোথায় না পৌঁছেছে। রাস্তার প্রত্যেক বাঁকে  বাঁকে  অনিশ্চয়তা। নারীর শরীরের বিভঙ্গে যে সৌন্দর্যকে বর্ণনা করা হয় প্রকৃতিকে নারী হিসেবে কল্পনা করলে তা বর্ণনা করা এক কথায় অসম্ভব। অনেকটা ঠিক ভয়ঙ্কর সুন্দরের মতো।

গন্তব্যে পৌঁছে ভিউ পয়েন্টে এসে দাঁড়ালাম। পাহাড়ে ঘেরা হ্রদের নীল জলে সাদা সাদা বোটেরা অল্প অল্প গুল্লিভার্স ট্রাভেলসের প্রতি ভালোবাসাকে  উস্কে দেয়। গোদের ওপর বিষফোঁড়া হলো বাঙালি হয়ে দার্জিলিং আর সিকিমের সেন্টিমেন্ট। প্রত্যেক পাহাড়ের খাঁজেই আমি স্লিপিং বুদ্ধ খুঁজি। তারপর নিজেই নিজেকে বুঝিয়ে বলি ,” ওহে মূর্খ নারী, ইহা অ্যারিজোনা।”

এই প্রদেশের প্রধান নদী হলো “সল্ট রিভার”। সেই সল্ট রিভার ওপর বাঁধ দিয়ে এই লেক তৈরী”-Tonto National  Park” এর ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের সীমানায় পা রেখে যখন ভিউ পয়েন্টে পৌঁছেছিলাম তখন দুজনের হৃদ কম্পনে এড্রিনালিন এর বন্যা। সাংঘাতিক রাস্তা পেরিয়ে এই অবধি জীবন্ত পৌছতে পেরেছি তাতেই নিজেদেরকে সেই মুহূর্তে সব থেকে বেশি সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিল। তাই আণুবীক্ষণিক নির্যাসের লোভ কাটিয়ে আরো ৩ মাইল  অতিক্রম করে একদম লেকের ধার অব্দি পৌঁছনোর সাহস না দেখিয়ে পত্রপাঠ ফেরতের দিকে রাস্তা ধরলাম।

রাস্তায় বাঁকের ধার ক্রমশ কমেছে। কথা মতন Gold Field Ghost Town -এর বাইরে ফেরার পথে গাড়ি দাঁড় করলো বেটার হাফ। Ghost Town শব্দটা শুনলে প্রথমে ভুতুড়ে লাগলেও এখানে এই শব্দের প্রয়োগ অন্য অর্থে ডেজার্টেড বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৮৯৩ সালে তৈরী ছোট্ট একটা জনপদ, গোল্ড মাইন ঘিরে গড়ে ওঠা শহরটা সোনার নির্যাস শেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে নিজেও মানুষ শূন্য হয়ে যায়। গোল্ড মাইন-এর জন্যে শহরটার প্রথম নাম গোল্ড ফিল্ড রাখা হয়। পরে একসময় খনি খালি হয়ে এলে শহরটাও খালি হয়ে যায়। ১৯১০ সালে মাইনিংয়ের কাজ আবার শুরু হলে শহরের নাম হয় Youngberge . সেক্রেটারি অফ অ্যারিজোনা,জর্জ  ইউ ইয়ং এর নামানুসরণে। কিন্তু আবার বছর পাঁচেকের মধ্যে গুটিয়ে যায় ব্যবসা। ফের খালি হয়ে যায় শহর। ১৯৮৪ সালে এই জায়গার খোঁজ পান ক্যাপ্টেন বব এবং বর্তমান মালিকানা তাঁরই। পুরনো নাম ফিরিয়ে দিয়ে একটা ঘুমিয়ে পড়া শহরকে জাগিয়ে তোলার কাজ শুরু হয় তখন থেকেই। কাঠামোরা  আবার দাঁড়িয়ে যায় নিজের নিজের জায়গায়। ব্যাঙ্ক,স্কুল, জেল, চার্চ,ব্রথেল ইত্যাদিরা  সব তৎকালীন গঠনে আবার তৈরী হয়। তবে সেগুলোর ভিতর থেকে এখন মিউজিয়াম, স্টেক  হাউস, ফটো স্টুডিও, আইসক্রিম পার্লার উঁকি মারে।

ঊনিশ শতকের আমেরিকার ওয়াইল্ড ওয়েস্ট কালচার মনের কোণে টোকা মারে কোথাও। এই বুঝি বন্দুক হাতের ঘোড়ায় চড়ে ছুটে যাবে কাউবয়। চোখে পড়ে অ্যারিজোনার একমাত্র ন্যারো গেজ রেলপথ, সাথে রেল গাড়ি।এখন সেটা ভ্রমণ বিলাসীদের গোল্ড ফিল্ড এর সফর সঙ্গী। টিকিট মাথাপিছু $ ৯।

আমরা যখন পৌঁছাই  তখন ঘড়িতে বিকেল ৪:৩০ বাজে। বিকেল ৫ টার পর শহর খালি করে বেরিয়ে যেতে হয়। তখন কারণ বুঝতে পারিনি। পরে রিসার্চ করে দেখলাম Ghost Town শুধু ডেজার্টেড না। অশরীরীদের  বসবাসস্থল। এমনিতেই রাতের অন্ধকারের কালোকে সবাই ভয় পায়। তাতে ভুতুড়ে সুড়সুড়ি। আর সুপারস্টিশন মাউন্টেন এর সুপারস্টিসিয়াস আলোরাও ছায়া ফেলে। আর সেই ছায়া এড়াতেই  ৫ ঘটিকার এই গন্ডি।

নিজের দেশের কুসংস্কার নিয়ে মুখ খুলবোনা। এদেশও পিছিয়ে নেই। জায়গার নামেও তারা দিব্যি বিরাজমান। তবে ভয়ের আঙ্গিকে সবটা ছেড়ে তাকে একদম একা করে দিতে পারেনি এদেশের মানুষগুলো। একটা ছোট শহরকে নিংড়ে নিয়ে যেমন স্বার্থান্বেষীদের মতো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেরকম দেড়শো বছর পরে হলেও সেটাতে প্রাণ সঞ্চার ও করেছে নতুন করে। অ্যারিজোনা রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাবার আগে কেমন ছিল যদি কখনো জানতে ইচ্ছে করে তাহলে ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে ঘুরে আসা যায় এই পরিত্যক্ত শহর থেকে।

শহর তুমি বেঁচে থাকো। অশরীরীরা সঙ্গী থেকো। মানুষ এখনো পুরাতনের পূজারী তাই যখন  ” Old is  Gold” তখন গোল্ড ফিল্ড এর স্বর্ণ সম্পদ কখনো শেষ হবার নয়। অতীতের  ভুল মুছে যাক এ ভাবেই।

আজকের লেখাতে আমেরিকার গোষ্ঠীগত অভিনবত্ব নেই। আজকের লেখাটুকু শুধু প্রকৃতির জন্যে থাক। আজকের লেখাটুকু শুধু মানুষের জন্যে থাক।