|| আশিস ভট্টাচার্য, মহাকাশ বিজ্ঞানী||

আমাদের গর্ব যে আমরা চাঁদে স্যাটেলাইট পাঠাতে পেরেছি। তবে এখনই কোনও সুফল পাবেন না। এক বছর, দুবছর নয়, বেশ কিছু বছর সময় লাগবে। এমন একটা সময় আসবে, এখন যেমন মানুষ ইউরোপ সফরে যান, তখন মানুষ চাঁদ সফরে যাবে। তবে সেটা সময় সাপেক্ষ।চন্দ্রযান-২ মিশনের বেশ কয়েকটি দিক রয়েছে। সেগুলি হলঃ

চাঁদে জলের খোঁজ পেয়েছিল চন্দ্রযান-১। চন্দ্রযান-১ মিশনের সাফল্য সেখানেই। চন্দ্রযান-২ মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অভিয়ান চালানো। চাঁদের এই অংশটি শ্যাডো জোনে থাকে। চাঁদের এই অংশটিতে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না।

চাঁদের দক্ষিণাংশে চন্দ্রযান-২ পাঠানো ছিল একটা চ্যালেঞ্জিং মিশন।ইসরোর বিজ্ঞানীদের মতে, সব চেয়ে কম খরচে সংগঠিত এই মিশনে সাফল্য মিলেছে ৯৫ শতাংশ। 

মিশনের প্রধান তিনটি ধাপ ছিল- অরবিটার,ল্যান্ডার বিক্রম এবং রোভার প্রজ্ঞান। ইসরোর প্রথম চেয়ারম্যান বিক্রম সারাভাইয়ের নামানুসারে ল্যান্ডারের নাম রাখা হয় বিক্রম।

চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের পর ল্যান্ডার থেকে বেরিয়ে আসবে রোভার প্রজ্ঞান। ‘প্রজ্ঞান’ শব্দের অর্থ প্রকৃষ্ট বা বিশেষ জ্ঞান।

এর আগে আমরা মঙ্গল অভিযান করেছিলাম। সে ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যাল রকেট। আর চন্দ্রযান-২ এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে জিওসিনক্রোনাশ স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যাল রকেট।সেই কারণেই সুরক্ষিত ভাবে পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে মহাকাশে পাড়ি জমাল চন্দ্রযান-২। মনে রাখতে হবে, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব প্রায় ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার।

মহাকাশের গভীর শূন্যস্থান থেকে চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ ছিল চন্দ্রযান-২র তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ, জিএসএলভিতে সওয়ার চন্দ্রযান-২ চাঁদের কক্ষপথের দিকে এগোচ্ছিল দুরন্ত গতিতে। পরের দিকে এসে গিয়েছিল গতিবেগ কমানোর সময়। তা না হলে চাঁদের কক্ষপথ ছেড়ে চন্দ্রযান-২ হারিয়ে যেত মহাকাশের মহাশূন্যে। রকেটের গতিবেগ কমানোর ক্ষেত্রেও আসে সাফল্য। এবং শেষমেশ চন্দ্রযান-২ প্রবেশ করে চাঁদের কক্ষপথে।

এবার সময় আসে হাই অল্টিটিউড থেকে ধীরে ধীরে বিক্রমকে ১০ মিটার উচ্চতায় নিয়ে আসার। তার পরেই ধীর গতিতে চন্দ্রপৃষ্ঠ স্পর্শ করবে বিক্রম।

প্রথম তিনটি ধাপ সাফল্যের সঙ্গে পার করা হয়েছিল। চন্দ্রযান-২ এর মিশন কন্ট্রোলরুম ব্যাঙ্গালোর থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা ভিডিওতে প্রতিটি ধাপই দেখানো হয়েছিল।

রাফ ব্রেকিং ফেজ এর ক্ষেত্রেও সাফল্য এসেছিল।তারপর ফাইন ব্রেকিং ফেজে গিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ল্যান্ডার বিক্রমের সঙ্গে।

সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে,ল্যান্ডারের ব্রেকিং থ্রাস্টের পরিমাণ বেশি হয়ে যাওয়া। এর জেরেই বন্ধ হয়ে যায় কমিউনিকেশন লিংক।

আশা করা যায়, সাধারণ প্রক্রিয়ায় সফট্ ল্যান্ডিং করেছে বিক্রম। নিয়মমাফিক রোভার প্রজ্ঞানও ল্যান্ডার থেকে বেরিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। কমিউনিকেশন লিংক চালু হলেই সমস্ত তথ্য ইসরোর কছে আসা শুরু হয়ে যাবে।

রবিবার ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবাম জানিয়েছেন, বিক্রমের হার্ড ল্যান্ডিং হয়েছে। তবে ক্র্যাশ ল্যান্ডিং হলে ল্যান্ডার ভেঙে টুকরো হয়ে গিয়েছে।

তবে শেষমেশ আশারবাণী মিলেছে। চাঁদের কক্ষপথে ঘুরতে থাকা অরবিটারের ক্যামেরা বিক্রমের অবতরণ ক্ষেত্রের দিকে ফোকাস করে থার্মাল ইমেজ পাঠিয়েছে। চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের ক্ষেত্রে দুটি স্থান ঠিক করা হয়েছিল। যদিও বিক্রম নিজেই নির্ধারণ করত কোথায় ল্যান্ডিং করতে হবে।

এবার বিক্রম নির্ধারিত দুটি জায়গায় অবতরণ করেছে, না অন্য কোথাও করেছে, তা বলা যাবে থার্মাল ইমেজ যাচাইয়ের পরেই। ইমেজ প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে জানা যাবে বিক্রমের অবস্থানও। সেটি সোজাসুজি না এক দিকে হেলে পড়েছে, তাও জানা যাবে তখনই। তবে এটা ঠিক, ক্র্যাশ ল্যান্ডিং হয়নি বিক্রমের, হার্ড ল্যান্ডিংই হয়েছে। 

হার্ড ল্যান্ডিংয়ের জন্য বিক্রম যদি কোনও থ্রেটারের মধ্য ঢুকে পড়ে, সেক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে বিজ্ঞানীদের। কারণ, থ্রেটারগুলি শ্যাডো জোনের মধ্যে পড়ে। সেখানে সূর্যালোক পৌঁছাতে পারে না। আর সূর্যালোক না পৌঁছলে বিক্রমের সোলার সেলগুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকবে। তখন বিক্রমের ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রগুলি পর্যাপ্ত ইলেকট্রিকের অভাবে মিশন কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে না।

তবে আমি যথেষ্ট আশাবাদী, বিক্রম কোনও থ্রেটারের মধ্যে পড়েনি। থার্মাল ইমেজ প্রসেসিং হলেই তা জানা যাবে। হাতে এখনও সময় রয়েছে। এর মধ্যে সংযোগ স্থাপন হলেই রোভারকে বের করে আনা সম্ভব হবে। ততদিনে চন্দ্রপৃষ্ঠে তার কাজ অনেকটাই করে ফেলতে পারবে প্রজ্ঞানও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here